![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি, প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। পরিদর্শন শেষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও এই বন্দিশালার একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল এবং সেখানে তার ওপর নির্যাতন চালানোর তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআইয়ের জেআইসি সেল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
আমিনুল ইসলাম বলেন, জেআইসি ছিল এমন একটি গোপন বন্দিশালা, যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটক করে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। পরবর্তীতে এটি ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়।
তিনি বলেন, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর বন্দিদের সেখানে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। পরিদর্শনের মাধ্যমে সেই বন্দিশালার পরিবেশ ও সেখানে বন্দিদের অবস্থার নির্মম বাস্তবতা কিছুটা অনুভব করা গেছে বলেও জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ব্রিগেডিয়ার আজমীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে এই জেআইসি সেলে আটক রাখা হয়েছিল। তাদের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
‘ওয়ান-ইলেভেনে তারেক রহমানকেও সেখানে আনা হয়েছিল’
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় তাকে ওই জেআইসি সেলের কোনো একটি কক্ষে আনা হয়েছিল। তদন্তে সাক্ষীদের দেওয়া বর্ণনা থেকে তার ওপর নির্যাতনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে বিচারপ্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা হবে।
‘অমানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল’
বিগত সরকারের আমলে গোপন বন্দিশালা প্রতিষ্ঠা ও সেখানে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি অমানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে তারা মনে করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য সরকারের কথিত অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ‘আয়নাঘর’ নামে বিভিন্ন টর্চার সেল পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ইসলামিক সংগঠনের নেতা এবং ভিন্নমতের ব্যক্তিদের ধরে এনে আটক রাখার অভিযোগ রয়েছে।
অনেককে পরবর্তীতে গুম করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাদের মধ্যে অনেকের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, অনেক ভুক্তভোগীকে মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর আটকে রেখে তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার কথা
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ডিজিএফআই ও জেআইসি সেলের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের বিচার চলছে।
ভবিষ্যৎ তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরও এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানান তিনি।
হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বন্দিত্বের তথ্য
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, হুম্মাম কাদের চৌধুরীকেও জেআইসি সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তার নিজের হাতে লেখা একটি চিহ্নিত নথি ও বন্দিত্বের বর্ণনার সঙ্গে জেআইসি সেলের একটি কক্ষের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষটির কিছু অংশ পরে সাদা রং ও প্লাস্টার করা হলেও সেখানে থাকা পুরোনো লেখার অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বর্ণনার সঙ্গে ওই কক্ষের মিল পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট আলামতগুলো সিলগালা করে রাখা হয়েছে।
বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব আলামত ট্রাইব্যুনালের হেফাজতে থাকার কথা জানান চিফ প্রসিকিউটর।
বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বন্দিশালা পরিদর্শন
ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই সদর দপ্তরে থাকা জেআইসির গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারপতি। ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজার নেতৃত্বে এ পরিদর্শনে চিফ প্রসিকিউটর এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে উত্তরায় র্যাব পরিচালিত একটি কথিত বন্দিশালা বা গুমঘরও পরিদর্শন করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, র্যাব ও ডিজিএফআই পরিচালিত কথিত বন্দিশালায় মানুষকে গুম করে রাখার অভিযোগে দুটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করা হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য