![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) স্বাক্ষরের মাধ্যমে এলডিসি-পরবর্তী বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। জাপানের পর দ্বিতীয়বারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে এমন উচ্চমানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি করল বাংলাদেশ, যা শুধু শুল্ক সুবিধা নয়; বরং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সেবাবাণিজ্য ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের নতুন ভিত্তি তৈরি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রবেশকারী বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে। ফলে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য হ্রাসকৃত বা শূন্য শুল্কে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ রপ্তানি পণ্যে শুল্ক ছাড় দেবে, যার মধ্যে কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, শিল্পকারখানার যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।
প্রায় এক বছরের আলোচনা ও দরকষাকষির পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়া এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন শেষে কার্যকর হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। তাদের ভাষ্য, দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত প্রযুক্তি, মূলধন ও উৎপাদন দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ কর্মশক্তি এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় মিলিয়ে নতুন শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চুক্তি কার্যকর হলে ৮ হাজার ৪২৮টি বাংলাদেশি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্ক সুবিধা পাবে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সেবা খাতের ১১১টি উপখাতে বাংলাদেশ প্রবেশাধিকার লাভ করবে, যা প্রকৌশলী, নার্সসহ দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এমন দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারও সমান জরুরি। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে স্বল্প সময়ে এমন উচ্চমানের চুক্তি সম্পন্ন করা বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই চুক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়ো বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এই সেপা। প্রযুক্তি, শিল্প সহযোগিতা, সাপ্লাই চেইন এবং বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি থাকলেও নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ২০০টিরও বেশি দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উৎপাদন শিল্পে কোরিয়ান বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিশাল আমদানি বাজারে বাংলাদেশ আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সঠিক নীতি বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এই সেপা চুক্তি এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠবে।