![]()
ইবি রিপোর্ট
সরকার নির্ধারিত দামেও মিলছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরবরাহ সংকটের মধ্যে নতুন করে মূল্য নির্ধারণ করা হলেও ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। আমদানি থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগে ভোগান্তি বাড়ছে গ্রাহকদের।
রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সরবরাহের ঘাটতি এবং অপারেটরদের কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কেনার কারণে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ টাকার বেশি
রাজধানীর হাতিরপুলের এক গ্রাহক জানান, গত ২ অক্টোবর ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে তাঁর খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে ডেলিভারি চার্জ ছিল ৫০ টাকা। সে সময় সিলিন্ডারটির সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
বাড়তি দামে বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে ওই বিক্রেতা জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে তাঁরও খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ কেনা সিলিন্ডারের পেছনে তাঁর ব্যয় হয়েছে ২ হাজার টাকা। সেটি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মিরপুরেও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। মুন্সীগঞ্জের বিক্রেতা জাকির হোসেন জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর তিনি আর গ্যাস পাননি। নতুন সরবরাহ কবে আসবে, তা ডিলারও নিশ্চিত করতে পারেননি। নতুন সিলিন্ডার পেলে তাঁর খরচ পড়বে ২ হাজার ২০০ টাকা বলে জানিয়েছেন তিনি।
সরবরাহের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দামের অভিযোগ
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যকাঠামো অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানি থেকে ডিলার বা পরিবেশকের ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার দাম ১ হাজার ৭৪২ টাকা। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
কিন্তু ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জের গ্রিন এলপিজির ডিলার মোজাম্মেল জানান, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তাঁর কাছে আর গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। নতুন মূল্য নির্ধারণের পরও অপারেটর তাঁর কাছে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৯০ টাকা চেয়েছে। অথচ নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৭৪২ টাকা।
মোজাম্মেলের দাবি, সেপ্টেম্বরে ২০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রির চাহিদা থাকলেও তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার সিলিন্ডার পেয়েছেন। গ্যাসবাহী গাড়ি কয়েক দিন ধরে মোংলায় আটকে থাকায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এসব খরচের কারণে প্রতি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রির প্রয়োজন হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতি অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ জানিয়ে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে। সমিতির তথ্য অনুযায়ী, নতুন মূল্য নির্ধারণের পর বিভিন্ন অপারেটর ডিলারদের কাছে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কয়েকটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে সিলিন্ডার দিচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, অপারেটরদের বাড়তি দাম এবং পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় ডিলারদের পক্ষে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, এভাবে ব্যবসা চালিয়ে গেলে অনেক পরিবেশক পুঁজি হারানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধেও সমস্যায় পড়তে পারেন।
আমদানি প্রায় একই, তবু সংকট কেন
বাংলাদেশে এলপিজির ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও এলপিজি আমদানি করে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। দুই মাসের আমদানির পরিমাণ কাছাকাছি হলেও বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় এর কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আমদানিকারক ও অপারেটরদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং প্রিমিয়াম বাড়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেরা আমদানি না করে অন্য অপারেটরের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে, তারাও পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ করেছে।
গ্রিন এলপিজির জিএম আহসান হাবিব হিরো বিবিসি বাংলাকে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান গত দুই বছর ধরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে না। অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে সরবরাহ করা হয়। সেপ্টেম্বরে ২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৫০ টন গ্যাস পেয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দাবি করেন, আমদানির কোটা এবং লাইসেন্স পেতে বিভিন্ন অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সরবরাহব্যবস্থাকে জটিল করেছে। দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির সুযোগ সীমিত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে গ্যাস সংগ্রহের ব্যয়ও বেড়েছে বলে তাঁর বক্তব্য।
তবে আমদানির পরিমাণের সঙ্গে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির সম্পর্ক কী, কিংবা কোথাও মজুত করে বাড়তি মুনাফা করা হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। কয়েকটি কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নির্ধারিত দাম কার্যকরে অভিযান
এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকেরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন।
বিইআরসিও জানিয়েছে, আমদানিসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আমদানি, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দামের অভিযোগের মধ্যেও গ্রাহকদের জন্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও সেই দামে রান্নার গ্যাস না পাওয়ায় বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।