ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আসিয়ানে বাংলাদেশের সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য, জানালেন জোটের মহাসচিব
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান (ASEAN)-এ বাংলাদেশের সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন জোটটির মহাসচিব কাও কিম হর্ন। তিনি বলেছেন, আসিয়ানের বর্তমান আইনি কাঠামো বা চার্টার অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরে অবস্থিত কোনো দেশকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। ফলে বাংলাদেশ এবং পাপুয়া নিউগিনি—দুই দেশেরই সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
ইন্দোনেশিয়ার সংবাদমাধ্যম জাকার্তা গ্লোব-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। একইভাবে পাপুয়া নিউগিনিও (পিএনজি) জোটে যোগ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি পিএনজির সদস্যপদের পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিল আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য দেশ ইন্দোনেশিয়া।
তবে সম্প্রতি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত দশম আসিয়ান মিডিয়া ফোরামে জোটের মহাসচিব কাও কিম হর্ন স্পষ্ট করে বলেন, পূর্ব তিমুরই আসিয়ানের সর্বশেষ সদস্য দেশ এবং আপাতত জোট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের জোট সম্প্রসারণ এখানেই শেষ হয়েছে।”
কাও কিম হর্ন আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, আসিয়ান চার্টারে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সংশ্লিষ্ট দেশকে অবশ্যই স্বীকৃত ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ হতে হবে।
তিনি বলেন, “আসিয়ান চার্টার অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মোট ১১টি দেশ রয়েছে। বাংলাদেশ ও পাপুয়া নিউগিনি এই ভৌগোলিক অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত। তাই বর্তমান নিয়মে তাদের সদস্য হওয়ার সুযোগ নেই।”
বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ, আর পাপুয়া নিউগিনি ওশেনিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ফলে বিদ্যমান চার্টার পরিবর্তন ছাড়া এ দুটি দেশের সদস্য হওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই।
আসিয়ানের আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নতুন সদস্য গ্রহণের নিয়ম পরিবর্তন করতে হলে জোটের সব সদস্য দেশের সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন। অর্থাৎ একটি দেশও আপত্তি জানালে চার্টার সংশোধন সম্ভব হবে না।
এ বিষয়ে কাও কিম হর্ন বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি ভবিষ্যতে চার্টার সংশোধন করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক সংজ্ঞা পরিবর্তন করে, তখন বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ১১ সদস্য নিয়েই আসিয়ান সীমাবদ্ধ থাকবে।
গত বছর দীর্ঘ ১৩ বছরের প্রচেষ্টার পর অবশেষে আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করে পূর্ব তিমুর। ২০১১ সাল থেকে দেশটি সদস্য হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়া নিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস-হোর্তা একসময় রসিকতা করে বলেছিলেন, “আসিয়ানের সদস্য হওয়ার চেয়ে স্বর্গে যাওয়া হয়তো সহজ।”
বাংলাদেশও গত কয়েক বছরে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার সভাপতিত্বকালে কুয়ালালামপুরের সমর্থন আদায়ের জন্য ঢাকা সক্রিয় তৎপরতা চালায়।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের কুয়ালালামপুর আসিয়ান সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো প্রকাশ্যে পাপুয়া নিউগিনির সদস্যপদের পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, পিএনজি আসিয়ানে যোগ দিতে আগ্রহী এবং বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, পাপুয়া নিউগিনি ১৯৭৬ সাল থেকেই আসিয়ানের পর্যবেক্ষক (Observer) মর্যাদা ভোগ করছে। এর ফলে দেশটি জোটের বিভিন্ন বৈঠকে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও পূর্ণ সদস্যপদের অধিকার পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আসিয়ান চার্টারে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলে বাংলাদেশের সদস্যপদ অর্জনের সম্ভাবনা বাস্তবে অত্যন্ত সীমিত। ফলে ভবিষ্যতে জোটটির সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য