ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে ওমান। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে দেশটি ইরানের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে প্রণালিটি ব্যবহারের জন্য স্বেচ্ছামূলক ফি বা টোল আদায়ের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবের টোল-সংক্রান্ত অংশে আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র এবং একজন পশ্চিমা কূটনীতিকের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রস্তাবটির মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্টি হওয়া বাণিজ্যিক অচলাবস্থা দূর করা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এখানে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক বা স্বেচ্ছামূলক টোল ব্যবস্থাকে তারা সমর্থন করে না।
মার্কিন এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালি কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধের আওতায় থাকা উচিত নয়। আলোচনায় টোল বা ফি আদায়ের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। যদিও ইরান নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
তেহরান জানিয়েছে, ওয়াশিংটন যতক্ষণ যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে, ততক্ষণ তারাও সামরিক হামলা চালাবে না। তবে একই সময়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্য করে ইরান একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া কয়েকটি ড্রোনও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা এসব ড্রোন হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল।
এদিকে জর্ডান, সৌদি আরব এবং উত্তর ইরানেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। জর্ডান মঙ্গলবার আরও একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। এসব ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। তবে চলমান সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইরান এর আগে ওমানকে প্রস্তাব দিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির একমুখী জাহাজ চলাচল ইরান এবং অন্য অংশ ওমান যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে ওমানের সর্বশেষ পরিকল্পনায় ইরানের একক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রাখা হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে স্বেচ্ছামূলক অর্থায়নের মাধ্যমে নৌপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির মডেল অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য স্বেচ্ছা অনুদান গ্রহণ করে থাকে।
এদিকে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
অন্যদিকে ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের একটি প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ থেকে জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। তবে তেহরান সতর্ক করে জানিয়েছে, যে দেশ বা কোম্পানি সেই অর্থ গ্রহণ করবে, তাদের ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে সৌদি বন্দর অবরোধের ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে টোল ব্যবস্থা, সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত থাকায় দ্রুত সমাধান পাওয়া সহজ হবে না।
পাঠকের মন্তব্য