![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ
একটি দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ বদলাতে কিছু প্রকল্প অনুঘটকের কাজ করে। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও প্রশাসনিক জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে চট্টগ্রামের আনোয়ারার ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড)। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরে এই সমঝোতা হয়েছিল। এক দশক পর একনেকের অনুমোদন ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করল। এই দীর্ঘসূত্রিতা কি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি, নাকি দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ভূদৃশ্য বদলে দেওয়ার এক নতুন সোপান?
সমঝোতা থেকে একনেক: দীর্ঘ এক দশকের হিসাব
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এক দশক দীর্ঘ সময়। ২০১৬ সালে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার সমঝোতা সই হয়। তখন বিশ্ব অর্থনীতির রূপরেখা ছিল ভিন্ন। নানা জটলা কাটিয়ে গত জুনে একনেক সভায় প্রকল্পটি পাস হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বিদেশি বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর অর্ধেকের বেশি অর্থ আসছে চীনের ঋণ থেকে। ২০৩১ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। বাহ্যিক দিক থেকে এটি বড় অর্জন। কিন্তু আমাদের দেশে মেগা প্রকল্পের ঘোষণায় যত দ্রুততা থাকে, বাস্তবায়নে তত ধীরগতি দেখা যায়। সময়মতো কাজ শেষ করা এবং ব্যয়ের লাগাম টানা এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।
অবস্থানগত সুবিধা ও কর্ণফুলী টানেলের সদ্ব্যবহার
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত এই জোনের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভূগোলের অবস্থান। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র ১৮ এবং শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্ণফুলীর তলদেশের টানেল।
দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল, কোটি কোটি টাকার টানেলের সুফল মিলছে কি না। নদীর দক্ষিণ পাড়ে পর্যাপ্ত শিল্পায়ন না হওয়ায় সেখানে যানবাহনের চাপ বাড়েনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চীনা জোন চালু হলে টানেলের উপযোগিতা বহুগুণ বাড়বে। নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পায়ন ও নগরায়নের স্বপ্ন এবার সত্যি হতে পারে। তবে অবকাঠামো ব্যবহারের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বিনিয়োগের ধরন: গুণগত মানই মুখ্য
এই শিল্প জোনে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান এবং ৫০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগের আশা করা হচ্ছে। এটি অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি আনবে। তবে এখানে কোন ধরনের শিল্প কারখানা স্থাপন হবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ী নেতারা সঠিকভাবেই বলেছেন, এই জোনে যদি শুধু গতানুগতিক পোশাক কারখানা করা হয়, তবে তা কার্যকর হবে না। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে আছে, যেখানে সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। প্রযুক্তিভিত্তিক, ভারি শিল্প, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। সিইআইজেডকে একটি আধুনিক বিশেষায়িত জোন করতে হলে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট কৌশল থাকতে হবে।
বাস্তবায়নের পথে অন্তরায়: আমলাতন্ত্র ও লজিস্টিকস
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রধানত তিনটি বিষয় দেখেন—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনি স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সেবা। আমাদের দেশে বিনিয়োগের বড় বাধা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও ইউটিলিটি সার্ভিসের অনিশ্চয়তা।
চিটাগাং চেম্বার জানিয়েছে, এই জোনে বিনিয়োগ টানতে হলে কাস্টমস সেবা সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা চাই। প্রতিটি দিনের বিলম্ব উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। তাই বেজাকে সমন্বিতভাবে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশগত সচেতনতা ও টেকসই উন্নয়ন
আধুনিক শিল্পায়নের অন্যতম শর্ত পরিবেশ রক্ষা। আনোয়ারার মতো সম্ভাবনাময় জনপদে বৃহৎ শিল্পায়ন হলে দূষণের ঝুঁকি বাড়বে। স্বস্তির বিষয় হলো, প্রকল্পের নকশাতেই সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই বিধানগুলো যেন কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিল্পায়নের প্রভাবে যেন প্রতিবেশ হুমকির মুখে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
চীনা অর্থনৈতিক জোন কেবল দুই দেশের বাণিজ্যের স্মারক নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পায়নের মাইলফলক। একটি জি-টু-জি অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে এর সাফল্য দেশের অন্যান্য জোনের ভবিষ্যৎ নির্দেশ করবে।
দশকব্যাপী প্রতীক্ষার পর এর কাজ শুরু হয়েছে। এখন ভুলের অবকাশ নেই। প্রকল্পটির সফলতার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। ২০৩১ সালের মধ্যে যদি এই জোনটি উৎপাদনে যায়, তবে এটি পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এই সূচনা যেন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি না হয়ে কর্মসংস্থানের বাস্তব রূপকার হয়।
পাঠকের মন্তব্য