![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানে নতুন কৌশল, তিন মাসে জব্দ ৫২ কেজির বেশি স্বর্ণ
হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালানের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের চালান বেশি ধরা পড়ত, সেখানে চলতি বছর থেকে ১৫ কেজি বা তারও বেশি ওজনের স্বর্ণের চালান জব্দ হচ্ছে। একই সঙ্গে চোরাকারবারীরা রুট ও কৌশল বদলে আরও সংগঠিতভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত তিন মাসে বিমানবন্দরে পরিচালিত তিনটি বড় অভিযানে ৫২ কেজিরও বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১২০ কোটির বেশি টাকা। এসব ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে এবং একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পড়া চালানগুলোর পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাদের ধারণা, যেসব চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর পরিমাণ আরও বড় হতে পারে। সীমান্ত এলাকায় যেসব স্বর্ণ উদ্ধার হচ্ছে, তার বড় অংশই বিমানবন্দর হয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে সেখানে পৌঁছানো হয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।
কর্মকর্তাদের মতে, বিমানপথে স্বর্ণ আনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় চোরাকারবারীরা এখন নতুন কৌশল ও বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। এসব তৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারিও আরও বাড়ানো হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারীমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তার দাবি, জোরদার নজরদারির কারণেই একের পর এক স্বর্ণের চালান জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে।
কার্গোতে ফলের ক্যারেটে লুকানো স্বর্ণ
গত ১৯ জুলাই ডিজিএফআই ও ঢাকা কাস্টমস হাউসের যৌথ অভিযানে কার্গো ভিলেজ থেকে অন্তত ১৬ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। রামবুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি ফলের ক্যারেটের ভেতরে বিশেষ কৌশলে স্বর্ণ লুকানো ছিল। গোয়েন্দাদের মতে, হংকং হয়ে কার্গো চালানের মাধ্যমে এই স্বর্ণ বাংলাদেশে আনা হয়েছিল।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, আমদানি করা পণ্যের ভেতরে এভাবে স্বর্ণ লুকিয়ে আনার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে নতুন কৌশল হিসেবে দেখা দিয়েছে।
দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটেও নতুন কৌশল
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানান, দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটও এখন স্বর্ণ পাচারের নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কৌশলে দুবাই থেকে আসা একজন যাত্রী বিমানে স্বর্ণ বহন করেন। পরে চট্টগ্রাম থেকে একই ফ্লাইটে ওঠা আরেক সদস্যের কাছে বিমানের ভেতরেই সেই স্বর্ণ হস্তান্তর করা হয়।
ঢাকায় পৌঁছে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে একজন বেরিয়ে গেলেও অন্য ব্যক্তি অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে স্বর্ণ নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে নিয়মিত তল্লাশি না থাকায় এই পদ্ধতিকে তুলনামূলক সহজ বলে মনে করছে চক্রটি।
গত ২৩ জুলাই এই কৌশল ব্যবহার করে পাচারের সময় ৭২০ গ্রাম স্বর্ণসহ একজনকে আটক করা হয়।
তিন মাসে তিন বড় অভিযান
গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।
এরপর ২ জুলাই একই ধরনের আরেক অভিযানে বাংলাদেশ বিমানের আরেকটি ফ্লাইট থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
সবশেষ ১৯ জুলাই কার্গো ভিলেজে ফলের ক্যারেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখা আরও ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। এসব ঘটনার পর তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, আগের কৌশল শনাক্ত হয়ে যাওয়ায় চোরাকারবারীরা এখন কার্গো ব্যবস্থাও ব্যবহার শুরু করেছে।
তদন্তে মিলছে বড় চক্রের ইঙ্গিত
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম দুটি ঘটনার মধ্যে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। একই ধরনের কৌশল, একই এয়ারলাইনস এবং প্রায় সমপরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের কারণে ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তে বাংলাদেশ বিমানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার জানান, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, চোরাকারবারীরা যেভাবে নতুন নতুন কৌশল ও রুট ব্যবহার করছে, তা নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। তাই ভবিষ্যতে স্বর্ণ চোরাচালান রোধে বিমানবন্দর, কার্গো টার্মিনাল এবং অভ্যন্তরীণ আগমনী অংশে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পাঠকের মন্তব্য