ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রাজধানী ঢাকার ৪১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী ‘ঢাকা দিবস-২০২৬: হৃদয়ে ঢাকা’ উদযাপনের জন্য দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সর্বনিম্ন ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সরশিপ চেয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে এই অর্থায়নের আহ্বান জানানো হলেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, আগামী ১ আগস্ট থেকে সাত দিনব্যাপী ‘ঢাকা দিবস-২০২৬: হৃদয়ে ঢাকা’ উদযাপন করা হবে। ‘আমার শহর, আমার দায়িত্ব: আমি বদলাই, ঢাকা বদলাবে’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী মেলা, ম্যারাথন, সাইক্লিং, কনসার্ট, প্রদর্শনীসহ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এসব আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা হবে।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালামের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক চিঠিতে নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ ছিল না, পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে সর্বনিম্ন ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সরশিপের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
তবে এই উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি)। তাদের মতে, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা কমেছে এবং অনেক ব্যাংক লোকসানের মুখে রয়েছে। এমন অবস্থায় একটি উৎসব আয়োজনের জন্য কোটি কোটি টাকার স্পন্সরশিপ দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যাংক খাতের কর্মকর্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সিএসআর তহবিল মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। সাত দিনের উৎসব, মেলা বা কনসার্টে এ তহবিল ব্যবহারের কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই।
একাধিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমানতকারীদের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। তাই জনকল্যাণমূলক নয়—এমন কর্মসূচিতে সিএসআর তহবিল ব্যয় করা যৌক্তিক হবে না।
অন্যদিকে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকার দীর্ঘ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। তিনি স্বীকার করেন, ব্যাংকের অর্থায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে কতটুকু সহযোগিতা পাওয়া যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙাচোরা সড়ক এবং নাগরিক সেবার নানা সংকট এখনও সমাধান হয়নি। এমন বাস্তবতায় উৎসব আয়োজনের পরিবর্তে নগর অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তার মতে, এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থ চাওয়ার নৈতিক ভিত্তি নেই এবং এটি অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি উদযাপন অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তবে জনদুর্ভোগ নিরসন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের আয়োজন হলে তা আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য