![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মূলধন ঘাটতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এ পরিচালিত চারটি শাখার কার্যক্রম বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় পরিশোধিত মূলধন বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই) জনতা ব্যাংকের ওপর একাধিক নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর মধ্যে নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলা বন্ধ রাখা, ডেবিট লেনদেন সীমিত করা এবং ধাপে ধাপে বিদ্যমান ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
জানা গেছে, ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সেখানে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন রয়েছে মাত্র ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ মূলধনের ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিবিইউএই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে জনতা ব্যাংক ইউএই শাখার মূলধন ৭৫ মিলিয়ন থেকে ১০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করলেও তা বর্তমান নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট হয়নি।
গত ৮ জুলাই ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী গভর্নর আহমেদ সাঈদ আল কামজি জনতা ব্যাংকের ইউএই প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা জানান। পাশাপাশি নতুন গ্রাহক গ্রহণ বন্ধ রেখে বিদ্যমান দায়-দেনা নিষ্পত্তির মাধ্যমে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ৮৮৪তম সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, ব্যাংকটি ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তিন বছরে ধাপে ধাপে পরিশোধিত মূলধন ৪০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে। যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সরকারের সহায়তায় মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারও অত্যন্ত বেশি হলেও ব্যাংকটি এখনও নিয়মিত সরকারি এলসি, কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ছোট গ্রাহকদের নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকটির নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতি ছিল ৫০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জনতা ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকের নিট সুদ আয়ও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে ইউএইর আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল-আইনে জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব শাখা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স সেবা, এনআরবি ব্যাংকিং, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, ট্রেড ফাইন্যান্স, গ্যারান্টি সুবিধা এবং সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরকার দ্রুত মূলধন জোগানের সিদ্ধান্ত না নিলে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শাখাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং সেবা এবং রেমিট্যান্স কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।