![]()
আহমেদ তোফায়েল
বাংলাদেশে বীমা খাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। জনসংখ্যা, অর্থনীতির আকার, মধ্যবিত্তের সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বাস্তবতা বিবেচনায় এই খাত আরও বড় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দেশে বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। সবচেয়ে বড় কারণ, মানুষ বীমা কিনতে চায় না। আর যারা কিনেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়।
এর অন্যতম কারণ, সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ না হওয়া। একজন গ্রাহক যখন বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেন, তখন তিনি মূলত একটি প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখেন। সেই প্রতিশ্রুতি হলো—প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই সময় যদি তাঁকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে শুধু একটি কোম্পানির প্রতি নয়, পুরো খাতের ওপরই মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়।
এ বাস্তবতায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বকেয়া দাবি পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্বল কোম্পানির সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং গ্রাহক সুরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেছেন। প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?
আস্থার সংকটই বড় সংকট:
বীমা ব্যবসা মূলত বিশ্বাসের ব্যবসা। এখানে দৃশ্যমান কোনো পণ্য নেই। একজন মানুষ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্ষতির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা কিনে রাখেন। ফলে এই খাতে আস্থা ভেঙে গেলে ব্যবসার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে অভিযোগ রয়েছে, দাবি নিষ্পত্তিতে অযৌক্তিক বিলম্ব, অতিরিক্ত কাগজপত্রের ঝামেলা, অস্বচ্ছতা এবং অনেক ক্ষেত্রে দাবি প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে—বীমা করলে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না বা কঠিন।
এই ধারণা পুরোপুরি সত্য না হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা একে শক্তিশালী করেছে। এর ফলে দেশের বীমা প্রবেশহার (Insurance Penetration) এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খুবই কম। অনেক পরিবার স্বাস্থ্য, জীবন কিংবা সম্পদ সুরক্ষায় বীমাকে প্রয়োজনীয় আর্থিক উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করে না।
৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া:
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকাই আটকে আছে মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানে।
এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবার, যারা হয়তো চিকিৎসার খরচ, দুর্ঘটনা, মৃত্যু, ব্যবসায়িক ক্ষতি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণের আশায় অপেক্ষা করছে।
যখন একটি দাবি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন শুধু একজন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। তাঁর আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও পরিচিতদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়। ফলে নতুন গ্রাহকও বীমা থেকে দূরে সরে যান।
সম্পদ নগদায়নের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত:
আইডিআরএ জানিয়েছে, দুর্বল কোম্পানিগুলোর জমি, ট্রেজারি বন্ড, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদ পর্যায়ক্রমে নগদায়ন করে আলাদা ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে। এরপর ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতিতে পুরোনো দাবিগুলো আগে পরিশোধ করা হবে।
এটি একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হতে পারে। কারণ অনেক কোম্পানির সম্পদ রয়েছে, কিন্তু তার উল্লেখযোগ্য অংশ অলস বা অনুৎপাদনশীল। এসব সম্পদ সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও স্বচ্ছভাবে বিক্রি করা গেলে দাবি পরিশোধের জন্য অর্থের জোগান তৈরি হতে পারে।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, স্বচ্ছ বিক্রয়, আদালতের জটিলতা এবং প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে না। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বাধীন নিরীক্ষক, শক্তিশালী তদারকি এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
কমিশন বাণিজ্যের সংস্কৃতি বন্ধ করতেই হবে:
বাংলাদেশের বীমা খাতে অতিরিক্ত কমিশন দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবসার চেয়ে কমিশন পাওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে কোম্পানির ব্যয় বেড়েছে, আর্থিক সক্ষমতা কমেছে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন গ্রাহক।
আইডিআরএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, বেতন বা চুক্তির আড়ালে কমিশন দেওয়ার মতো অনিয়মও নজরদারির আওতায় আসবে।
এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের বড় অংশ যদি কমিশনেই ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে দাবি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল দুর্বল হয়ে পড়বে।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি:
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (Risk-Based Supervision) চালু হয়েছে। শুধু নিয়ম মেনে কাগজপত্র জমা দিলেই হবে না। বরং কোন কোম্পানির আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে, কোথায় তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে, কোথায় বিনিয়োগ অস্বাভাবিক—এসব আগেভাগেই শনাক্ত করতে হয়।
বাংলাদেশেও যদি এ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা যায়, তাহলে অনেক সমস্যা বড় আকার নেওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার। কেবল নীতিমালা ঘোষণা করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
ইউনিক পলিসিহোল্ডার আইডি চালুর পরিকল্পনা ইতিবাচক। এটি বাস্তবায়িত হলে জাল পলিসি, তথ্য গোপন কিংবা গ্রাহক প্রতারণার ঝুঁকি কমবে।
এছাড়া মোবাইল ফোনভিত্তিক তথ্যপ্রদান ব্যবস্থা চালু হলে গ্রাহক নিজের পলিসির অবস্থা সহজেই জানতে পারবেন। ভবিষ্যতে যদি একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে দাবি দাখিল, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে স্বচ্ছতা আরও বাড়বে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল সেবা শুধু সুবিধা নয়, এটি সুশাসনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
শুধু দুর্বল কোম্পানি নয়, পুরো খাতে সংস্কার প্রয়োজন:
বর্তমানে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি কোম্পানিকে কেন্দ্র করে সংস্কার শুরু হলেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতকে একই মানদণ্ডের আওতায় আনতে হবে।
ভালো কোম্পানিগুলোকেও নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি বাড়াতে হবে। নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন করতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রকাশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইন ভঙ্গ করলে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অনেক সময় অনিয়মকে উৎসাহিত করে।
সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়ন:
বাংলাদেশে নীতিমালা ঘোষণা নতুন বিষয় নয়। অতীতেও নানা সংস্কার পরিকল্পনা এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। তাই এবারও মানুষ ঘোষণা নয়, ফলাফল দেখতে চাইবে।
যদি আগামী কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু হয়, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বার্তা। মানুষ বুঝতে পারবে, পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। অন্যদিকে যদি আগের মতোই ফাইল ঘুরতে থাকে, তাহলে নতুন ঘোষণাও আগের অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে।
একটি শক্তিশালী বীমা খাত শুধু গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উৎস তৈরি করে, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনে, অবকাঠামো অর্থায়নে ভূমিকা রাখে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক অভিঘাত কমাতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশ যখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দিকে এগোতে চায়, তখন একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য বীমা খাত অপরিহার্য। ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আর্থিক খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে বীমার ভূমিকা বাড়াতে হবে।
পরিশেষে বীমা খাতের বর্তমান সংকট মূলত আস্থার সংকট। এই আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, গ্রাহকের ন্যায্য দাবি দ্রুত পরিশোধ করা। আইডিআরএর নতুন উদ্যোগ সেই লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
স্বচ্ছ সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, কমিশন বাণিজ্য বন্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহক সুরক্ষা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা—এসব যদি সমন্বিতভাবে কার্যকর হয়, তাহলে বীমা খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আর যদি তা না হয়, তাহলে আস্থাহীনতার চক্র আরও দীর্ঘ হবে।
এখন সময় প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। কারণ বীমা ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন অর্থ নয়, মানুষের বিশ্বাস।
পাঠকের মন্তব্য