![]()
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়। এটি এই রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় ও চেতনার মূল ভিত্তি। তাই স্বাধীনতার বহু বছর পরও একাত্তরের ইতিহাস জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সংসদ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সর্বত্রই এখন এই ইতিহাস নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি কেবল ইতিহাস নয়, বরং জাতীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
এমন প্রেক্ষাপটে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বিশেষ অঙ্গীকার এসেছে। তিনি শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি যাচাইকৃত তালিকা তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন। এই উদ্যোগকে জাতীয় ইতিহাস সংরক্ষণের একটি বড় প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবে এই তালিকা বারবার বিতর্কিত হয়েছে বলে তিনি জানান। তাই এবার একটি প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো বীর সন্তানদের সঠিক স্বীকৃতি দেওয়া। তবে রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের ব্যবহার সত্যকে সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের এই নতুন উদ্যোগের তাৎপর্য অনেক গভীর। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব স্বাধীনতার বিরোধিতার বিষয়টি অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন।
গত ২০২৪ সালের নভেম্বরে জামায়াতের আমির একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেননি। কেবল স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের ভিন্ন মত ছিল। এমনকি অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের সাথে মিল ছিল বলেও জানান। দলটির চাঁদপুর জেলা আমিরও নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হিসেবে দাবি করেছেন।
ব্যক্তিগত পরিচয় যাই হোক, দলের মূল্যায়ন হয় প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার মাধ্যমে। এই কারণে সমালোচকরা জামায়াতের এই নতুন অবস্থানকে গ্রহণ করছেন না। ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত তথ্য অনুযায়ী, এই দলটির ভূমিকা ছিল পুরোপুরি স্বাধীনতা-বিরোধী। তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করতে বিভিন্ন বাহিনী গঠনে যুক্ত ছিল। শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর নির্যাতন সর্বজনবিদিত।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই সহযোগী বাহিনীগুলো চরম মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়। তারা বুদ্ধিজীবী হত্যা, সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও নৃশংসতা চালায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই অপরাধের বিচার সম্পন্ন করে। জামায়াতের তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এই রায় দলটির প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের ঐতিহাসিক সত্যকে আরও জোরালো করে।
সম্প্রতি সংসদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ সংশোধন আইন পাস করা হয়েছে। এই ২০২৬ সালের আইনে জামায়াতসহ বেশ কিছু দলকে আইনিভাবে স্বাধীনতাবিরোধী বলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী স্বাভাবিকভাবেই এই আইনের তীব্র বিরোধিতা প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও জামায়াতের এই ভূমিকার সমালোচনা করেছে। তারা জামায়াতকে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ডাকার চেষ্টার নিন্দা জানান।
গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শের পরিবর্তন হতেই পারে। তবে এই রূপান্তরের প্রধান শর্ত হলো অতীতের প্রতি সততা দেখানো। অতীতকে অস্বীকার করে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না। ভুল স্বীকার করা স্থায়ী শাস্তি নয়, বরং সত্যকে সম্মান জানানো। এই সত্যটি বর্তমান তরুণ ভোটারদের জন্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
আজকের তরুণ প্রজন্ম মূলত বর্তমান নীতি ও নেতৃত্বের ভিত্তিতে দল মূল্যায়ন করে। তবে একটি দলের অতীত ইতিহাস জানাও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। যে দল নিজের ইতিহাস নিয়ে স্পষ্ট হতে পারে না, তাদের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা তৈরি করা একটি বড় জাতীয় পদক্ষেপ। এই তালিকা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস জানাবে।
স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা বীরেরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। ফলে একাত্তরের স্মৃতি রক্ষার দায়িত্ব এখন তরুণদের কাঁধে এসে পড়েছে। বাংলাদেশ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও জাতীয় পুনর্মিলনের পথে এগিয়ে যাবে। তবে এই অগ্রযাত্রা ঐতিহাসিক সত্যকে বিসর্জন দিয়ে সম্ভব নয়। জামায়াত স্পষ্ট আত্মসমালোচনা না করলে জনমনে এই অবিশ্বাস চিরকাল থেকে যাবে।
পাঠকের মন্তব্য