![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে দেশের প্রথম সমন্বিত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম। চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার আমদানিকৃত ফ্ল্যাট স্টিলের বিকল্প দেশেই উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ১৫ লাখ টন। এখানে হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল, মাইল্ড স্টিল এবং স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদন করা হবে। বর্তমানে এসব পণ্যের পুরো চাহিদাই চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
বিএসআরএম জানিয়েছে, দেশীয় উৎপাদন শুরু হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে, শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের ভারী শিল্প, অবকাঠামো, জাহাজ নির্মাণ, রেলপথ, প্রকৌশল ও উৎপাদন খাতের জন্য একটি শক্তিশালী কাঁচামালভিত্তি তৈরি হবে।
কোম্পানির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কারখানায় আধুনিক ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (EAF) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যা প্রচলিত গ্যাসভিত্তিক প্রযুক্তির তুলনায় বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং কম কার্বন নির্গমন নিশ্চিত করবে।
সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে প্রকল্পের বিস্তারিত উপস্থাপন করেছে বিএসআরএম। বিশাল বিনিয়োগের এ প্রকল্পকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে সরকার থেকে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা এবং আমদানিকৃত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিলের ওপর ১০ বছরের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভূমি উন্নয়ন শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ বজায় থাকলে মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে। নির্মাণ শুরু হওয়ার প্রায় তিন বছরের মধ্যেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নতুন এই শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ, ভারী প্রকৌশল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, রেলওয়ে ও বৃহৎ অবকাঠামো খাত আরও গতিশীল হবে।
বিএসআরএমের কর্মকর্তারা জানান, অর্থায়নের বড় অংশ স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কনসোর্টিয়াম এবং কোম্পানির নিজস্ব ইক্যুইটি থেকে আসবে। যদিও অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বর্তমানে দেশে হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল, মাইল্ড স্টিল ও স্টেইনলেস স্টিলের বার্ষিক চাহিদা ২০ লাখ টনেরও বেশি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হলে আমদানি-নির্ভরতা কমবে, সরবরাহের সময় হ্রাস পাবে এবং ডাউনস্ট্রিম শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও লজিস্টিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রকল্পটি নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক সুরক্ষা দিলে বাজারে একচেটিয়া সুবিধা বা প্রতিযোগিতায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে কি না, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার প্রতিযোগিতামূলক বাজার বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে বিএসআরএমের দাবি, প্রস্তাবিত শুল্ক সুরক্ষা আমদানি বন্ধ করবে না; বরং দেশীয় উৎপাদনকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এতে ডাউনস্ট্রিম শিল্পের উৎপাদন ব্যয় মাত্র ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশ একটি শক্তিশালী আপস্ট্রিম ইস্পাত শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পে একটি কৌশলগত পরিবর্তন আসবে। নির্মাণ খাতের রড উৎপাদনের বাইরে গিয়ে দেশ প্রথমবারের মতো উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদনে প্রবেশ করবে, যা শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পাঠকের মন্তব্য