![]()
২০২৫ সালের শুরুতে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিপসিক উন্মুক্ত (ওপেন-সোর্স) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেল ‘আর-ওয়ান’ প্রকাশ করে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিনামূল্যে ডাউনলোডযোগ্য এই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) মার্কিন প্রযুক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং শক্তিশালী বাণিজ্যিক এআই মডেলগুলোর সমকক্ষ বলে দাবি করা হয়। এর প্রভাবে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার কমে যায় এবং সরকারি ডিভাইসে ডিপসিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবও ওঠে।
এরপর গত মাসে আরেকটি চীনা প্রতিষ্ঠান জেড.এআই তাদের ‘জিএলএম-৫.২’ মডেল উন্মোচন করে। এটির সক্ষমতা নিয়েও উচ্চ প্রশংসা করা হলেও এবার আগের মতো বৈশ্বিক আতঙ্ক বা আলোড়ন দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে চীনের দ্রুত অগ্রগতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছে বিশ্ব।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আরও শক্তিশালী এআই মডেল, উন্নত চিপ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে উন্নত এআই চিপ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের সর্বাধুনিক মডেল বিদেশিদের জন্য সীমিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ভবিষ্যতে ওষুধ আবিষ্কার, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক খাতে এর ব্যবহার বাড়ায় এটি এখন কৌশলগত নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে সরকারি বিনিয়োগের পক্ষেও মত দিয়েছেন।
এআই উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলেও বড় পার্থক্য রয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ওপেন-সোর্স মডেল প্রকাশ করে, যা ব্যবহারকারীরা বিনামূল্যে ডাউনলোড করে নিজেদের সার্ভারে চালাতে পারেন। বিপরীতে মার্কিন কোম্পানিগুলো ক্লাউডভিত্তিক, অর্থের বিনিময়ে ব্যবহারের সুযোগ দেয় এবং মডেলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো গোপন রাখে।
চীনা ওপেন-সোর্স মডেলগুলো সব ক্ষেত্রে মার্কিন প্রিমিয়াম মডেলের সমান না হলেও অনেক ব্যবহারকারীর জন্য সেগুলো যথেষ্ট কার্যকর। যুক্তরাজ্যের এক সফটওয়্যার ডেভেলপারের ভাষ্য অনুযায়ী, একই কাজ লোকাল সার্ভারে চীনা মডেলে করতে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি সময় লাগলেও সেটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্ভব হয়েছে।
জেড.এআইয়ের ‘জিএলএম-৫.২’ মডেলকে এআই মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস’ সবচেয়ে শক্তিশালী ওপেন-সোর্স এআই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং সক্ষমতা যাচাইয়ে এটি ওপেনএআইয়ের ‘জিপিটি-৫.৫’-কেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে একই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা মূল্যায়নে জিএলএম-৫.২ সামান্য পিছিয়ে রয়েছে, যা এআই মূল্যায়নের জন্য এখনো অভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না থাকার বিষয়টি সামনে আনে।
‘ওপেনরাউটার’ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, জিএলএম-৫.২ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এআই মডেলগুলোর একটি। তবে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ডিপসিকের সর্বশেষ মডেল। শীর্ষ ১০টি জনপ্রিয় এলএলএমের মধ্যে সাতটিই চীনা প্রতিষ্ঠানের তৈরি।
বিশ্লেষকদের মতে, জিএলএম-৫.২ প্রকাশের পর বড় ধরনের বাজার অস্থিরতা না হওয়ার কারণ হলো বিশ্ব ইতোমধ্যে মেনে নিয়েছে যে স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও রোবোটিক্সের মতো এআইয়েও চীন যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সার্জ বেলোনি বলেন, অতীতে সিলিকন ভ্যালি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করত এবং চীন দ্রুত তা অনুসরণ করত। এখন চীন কেবল উন্নয়নই নয়, ওপেন-সোর্স কৌশলের মাধ্যমে পশ্চিমা ক্লোজড-মডেল ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করছে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগোর অধ্যাপক মিখাইল বেলকিনের মতে, চীনা ওপেন-সোর্স মডেলগুলো বর্তমানের সেরা মার্কিন মডেলের তুলনায় প্রায় ৬ থেকে ৯ মাস পিছিয়ে থাকলেও এগুলো অনেক বেশি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য। কারণ ব্যবহারকারীরা একবার ডাউনলোড করলে ভবিষ্যতেও স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ডেভিড শ্রায়ারের মতে, এআই খাতে নেতৃত্ব মানে ভবিষ্যতের প্রায় ৬০ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের বাজারে প্রভাব বিস্তার। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব ব্যাপক। তিনি বলেন, সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে চীনা ও মার্কিন এআই মডেলের উত্তর প্রায়ই ভিন্ন হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফিলিপ টর মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি উন্নত এআই প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত চীনের জন্যই সুবিধাজনক হতে পারে। তার মতে, প্রযুক্তি থেকে কাউকে বিচ্ছিন্ন করলে তারা নিজস্ব প্রযুক্তি ও ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বাধ্য হয়—যেমনটি হুয়াওয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
ডেভিড শ্রায়ার আরও দাবি করেন, পশ্চিমা মডেলের কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে চীন দ্রুত নিজেদের প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়ে আনছে। তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতা দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, কর্পোরেট খাতে বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী অবস্থান সহজে নড়বে না। কারণ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা, নিয়ম মেনে চলা (কমপ্লায়েন্স) এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়। এই ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
অক্সফোর্ডের ফিলিপ টর সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ যদি নিজস্ব শক্তিশালী এআই শিল্প গড়ে তুলতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে তারা অন্য দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ‘এআই উপনিবেশে’ পরিণত হতে পারে। তার মতে, এআই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলোর একটি এবং এর নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে।
পাঠকের মন্তব্য