![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামই এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, ডিম কিংবা সবজির বাজারে গেলেই মূল্যস্ফীতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছরে মানুষের আয় কিছুটা বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণিও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং গবেষকদের মতে, শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত খাদ্য দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাজেটে কৃষি ভর্তুকি, খাদ্যশস্য সংগ্রহ, কৃষিঋণ সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষির আধুনিকীকরণ, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, উন্নত গবেষণা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াসিন বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাজারমুখী খাতে রূপান্তর করা হচ্ছে। উন্নত বীজ, কৃষি গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ, সৌরচালিত সেচ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং উৎপাদন-পরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তায় মৎস্যখাতের অবদান আরও শক্তিশালী করতে আধুনিক কোল্ড-চেইন, ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার, আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জনকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় খাতে পরিণত করাই এখন সরকারের লক্ষ্য।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল বাজার তদারকি বা আমদানি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। কোল্ড-চেইন, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক সংগ্রহ কেন্দ্র, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় কমানো এবং বাজারকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড-চেইন, লজিস্টিকস এবং মৎস্যখাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা ও উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এসব খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
সিএসইআরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় মৎস্যখাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ, ট্রেসেবিলিটি এবং কোল্ড-চেইনের ঘাটতির কারণে রপ্তানি সক্ষমতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠানটি আরও মনে করে, ব্লু ইকোনমিকে আগামী দশকের কৌশলগত প্রবৃদ্ধির অন্যতম খাত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, অফশোর অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সমুদ্রভিত্তিক রপ্তানি শিল্প গড়ে তুলতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে ধান, সবজি ও মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, আবার ভোক্তাদেরও বেশি দামে খাদ্য কিনতে হয়। এর প্রধান কারণ উৎপাদনের ঘাটতি নয়, বরং দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত হিমাগার, সংগ্রহ কেন্দ্র এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে।
সিএসইআরের মতে, কৃষি ও মৎস্যকে কেবল ভর্তুকিনির্ভর সামাজিক খাত হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক এবং রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোল্ড-চেইন, গবেষণা, উদ্ভাবন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ব্লু ইকোনমির সমন্বিত উন্নয়ন ঘটাতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও কমবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি লাভ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এর বাস্তব সুফল পেতে হলে কৃষি ও মৎস্য উভয় খাতেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, গবেষণা এবং রপ্তানিমুখী মূল্য সংযোজনকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।