![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর শুধু শিশুদের বিদ্যালয়ে আনা নয়; বরং তারা বিদ্যালয়ে গিয়ে কতটুকু শিখছে, সেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার যে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত উন্নয়নে কার্যকর অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এনজিওগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে আগ্রহী, তা সময়োপযোগী ও কৌশলগত একটি পদক্ষেপ। কারণ বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন আনা কঠিন।
কেন এককভাবে সরকারের পক্ষে যথেষ্ট নয়?
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।
- শিক্ষার্থীদের পাঠ বোঝার দক্ষতা ও গণিতভিত্তিক সক্ষমতার ঘাটতি।
- শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানে বৈষম্য।
- চর, হাওর, পাহাড়ি অঞ্চল ও বস্তিবাসী শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।
- প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা।
- শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা।
- ডিজিটাল শিক্ষা অবকাঠামোর অসম বিস্তার।
এসব কারণে সরকারের বিশাল প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এনজিওগুলোর সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনজিওগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার?
বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে এনজিওগুলোর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের কয়েকটি বিশেষ শক্তি রয়েছে।
প্রথমত, তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারে। চরাঞ্চল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চা-বাগান, বস্তি কিংবা বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের নিয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তারা উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা, আনন্দমুখর শ্রেণিকক্ষ, বহুশ্রেণি শিক্ষা (Multi-grade Teaching), বিকল্প শিক্ষা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন এনজিও ইতোমধ্যে সফল মডেল তৈরি করেছে।
তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও কমিউনিটি সম্পৃক্ততায় এনজিওগুলোর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, একজন দক্ষ শিক্ষকই শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের সবচেয়ে বড় নিয়ামক।
সরকারের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগ
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-4) মূলত একটি “Sector-Wide Approach” বা সমন্বিত কর্মসূচি, যেখানে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো একই লক্ষ্যে কাজ করছে। কর্মসূচিটির মূল লক্ষ্য হলো প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিশুর জন্য মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
এই কর্মসূচিতে সরকারকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে World Bank, Asian Development Bank, UNICEF, JICA এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ একাধিক উন্নয়ন অংশীদার।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে সরকারের পাশাপাশি এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশেও BRAC-এর নন-ফরমাল শিক্ষা কার্যক্রম বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত একটি মডেল হিসেবে পরিচিত।
ভবিষ্যতের শিক্ষা কেমন হওয়া উচিত?
বিশ্বব্যাপী শিক্ষা এখন মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে এগোচ্ছে। তাই বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে—
- ভাষা ও গণিতে মৌলিক দক্ষতা।
- সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তা।
- ডিজিটাল সাক্ষরতা।
- পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতনতা।
- অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা।
- মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক-আবেগিক শিক্ষা।
সফল অংশীদারিত্বের জন্য প্রয়োজন
১. সরকার, এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন।
২. তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত মূল্যায়ন।
৩. স্থানীয় সরকার, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা।
৪. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
৫. প্রকল্পনির্ভর নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শিক্ষা সংস্কার।
উপসংহার
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার লড়াই অনেকটাই সফল হয়েছে; এখন প্রয়োজন শেখার মান উন্নয়ন। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের নেতৃত্বের পাশাপাশি এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, উন্নয়ন সহযোগীদের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে একত্রিত করতে হবে।
একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই গড়ে উঠছে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক এবং দায়িত্বশীল নাগরিক। তাই শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সম্মিলিত জাতীয় অঙ্গীকার।