![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ সহাবস্থান নিয়ে একের পর এক কূটনৈতিক বৈঠক করছে উপসাগরীয় দেশগুলো। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা শুধু যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতা কমিয়ে নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রথমে ইরান ও ওমান, এরপর ওমান-কাতার, ইরান-সৌদি আরব এবং সর্বশেষ কাতার-সৌদি আরবের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ এবং ইরানের সঙ্গে একটি নতুন আঞ্চলিক সমঝোতায় পৌঁছানো।
আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি। ইরান প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে কী ধরনের আর্থিক সুবিধা পেতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে আগস্টের নির্ধারিত সময়সীমা সামনে রেখে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর এই আঞ্চলিক উদ্যোগ সেই আলোচনার সমান্তরালে এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
যদিও প্রকাশ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে মিল রেখে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও বাধাহীন নৌ-চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তবুও পর্দার আড়ালে ইরানের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সমঝোতার চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।
জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে ‘সার্ভিস ফি’ আদায়ের একটি সম্ভাব্য কাঠামো নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। প্রকাশ্যে এই অর্থ মাইন অপসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও বিমা সংক্রান্ত খাতে ব্যয় করা হবে বলে উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে তহবিল পরিচালনা ও অর্থ বণ্টনের কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে ইরান ইতোমধ্যে নবগঠিত গালফ স্ট্রেইট অথরিটি-এর মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী সব জাহাজের জন্য ইরানি বিমা বাধ্যতামূলক করা হবে। তেহরান মনে করছে, পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ তাদের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নৌপথে কোনো ধরনের টোল বা ফি আরোপ মেনে নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজে জাহাজ চলাচল, ড্রোন হামলা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তাদের নতুন কৌশল নিতে বাধ্য করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা এবং বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এদিকে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বহুমুখীকরণের পথে হাঁটছে উপসাগরীয় দেশগুলো। কুয়েত সম্প্রতি তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছে। একইভাবে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইউক্রেনের ড্রোন সহযোগিতাও নতুন নিরাপত্তা সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হলেও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় দেশগুলো বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘প্ল্যান বি’ ও ‘প্ল্যান সি’ প্রস্তুত করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য