![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এখনও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করলেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অভিযান ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে দেশটির উত্তরাঞ্চলে। এতে রাজধানী কারাকাসের নিকটবর্তী উপকূলীয় শহর লা গুইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু বহুতল ভবন মুহূর্তেই ধসে পড়ে এবং পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল একটি জরুরি পরিস্থিতি। উদ্ধার অভিযান এখনও চলমান থাকায় মৃতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার রাত ৮টা থেকে দুর্গত এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো।
এদিকে লা গুইরার একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে চিলির বিশেষ উদ্ধারকারী দল। চারটি বহুতল ভবন নিয়ে গঠিত ওই কমপ্লেক্সে শত শত পরিবার বসবাস করলেও ভবনগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধসে গেছে।
উদ্ধারকারী দলের প্রধান নাদিওমার পোলাঙ্কো বলেন, ভবনগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম। এখন মূলত মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে।
অন্যদিকে ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে বহু এলাকায় স্বজন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজার চেষ্টা করছেন। সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।
ভূমিকম্পে সন্তান হারানো মারহোসলি সালাজার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মাত্র পাঁচ মাস বয়সী তার শিশুপুত্র এখনও নিখোঁজ। একই ঘটনায় তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। তিনি দ্রুত উদ্ধার সরঞ্জাম ও সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে কারাকাসের একটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অন্তর্বর্তী নেতা দেলসি রদ্রিগেজ পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯০০ সালের পর এটিই ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ হলেও এত বড় বিপর্যয় দীর্ঘদিন দেখা যায়নি।
ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, অন্তত ১৭টি দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় মোতায়েন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্পেন, সুইজারল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও এল সালভাদরের উদ্ধারকারী দল মাঠে কাজ শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী নেতা দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার সঙ্গে কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারকারী দল, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ছাড়া ২৫০ জনেরও বেশি সদস্যের একটি মার্কিন দুর্যোগ মোকাবিলা দল ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। এতে প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুরসহ তিনটি বিশেষ উদ্ধার ইউনিট রয়েছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, ভূমিকম্পের আগেই ভেনেজুয়েলা খাদ্য সংকট, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিল। তাই এই দুর্যোগকে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
সরকারি তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন। এ পর্যন্ত ২৮ জন পর্তুগিজ, পাঁচজন স্প্যানিশ, সাতজন চীনা, দুইজন ব্রাজিলীয়, একজন চিলিয়ান এবং একজন ইতালীয়-ভেনেজুয়েলীয় নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া বহু বিদেশি নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুক্রবার অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের সব ম্যাচ শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।