![]()
বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল দিলেও সামগ্রিক চিত্র এখনও মিশ্র। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলের মতো বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি কমেছে।
চীন ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল বাজারগুলোর একটি। ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতার রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে দেশটিতে রপ্তানি ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ৭৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও ব্রাজিলেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা এসব অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত রপ্তানি বাজার ভারত হলেও সেখানে রপ্তানি ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। জুলাই-মে সময়ে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ কমে ৭৭৪ মিলিয়ন ডলারে এবং তুরস্কে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ৫৩৪ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ার বাজারেও রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে।
দেশভিত্তিক এই প্রবণতা তৈরি পোশাক খাতেও প্রতিফলিত হয়েছে। অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও সামান্য কমে ৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কানাডায় রপ্তানি বেড়েছে, তবে যুক্তরাজ্যে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও পোশাক, পাট ও চামড়াজাত পণ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী শ্রমনির্ভর পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে চীনের ক্ষেত্রে পণ্যের বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি, যেখানে পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, জুতা ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও বাড়ছে।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশকে দ্রুত নতুন বাজার সম্প্রসারণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি এবং বাজারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু তৈরি পোশাক বা কয়েকটি প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আরও বৈচিত্র্যময় রপ্তানি পণ্য, শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
সব মিলিয়ে, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু বাজারে সাফল্য বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য পূরণে এখনও অনেক পথ বাকি। নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য