![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নাগরিক জীবনকে বিপন্ন ও অসুস্থ করার জন্য মাদক সবচেয়ে বিপজ্জনক হাতিয়ার। মানুষের জীবন ও সমাজকে এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বের অনেক সরকারপ্রধান সংকটে পড়েছেন। আবার অনেকেই সফল হয়ে নিজেদের দেশকে গৌরবান্বিত করেছেন।
আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মাদককে ‘সব অপরাধের জননী’ বলতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাদকের বিস্তার রোধ করা গেলে সমাজকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকে ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরে ‘মিসইউজ অব ড্রাগস অ্যাক্ট’ পাস হয়। এই আইনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক রাখলে বা পাচার করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়।
একই সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দেওয়া হয় ব্যাপক ক্ষমতা। আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করে লি কুয়ান ইউ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল ছিলেন। তাঁর এই অনমনীয় অবদানে সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্র।
শুধু সিঙ্গাপুর নয়, বিশ্বের বহু দেশ মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর শাস্তির পথ বেছে নিয়েছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। মাদক সেবন বা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের অর্থদণ্ড। মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের আরেকটি বড় উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে ‘জনগণের এক নম্বর শত্রু’ ঘোষণা করেন। তাঁর শুরু করা এই অভিযান ইতিহাসে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযান আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। তবে দেশটির একটি বড় অংশের জনগণ এখনো বিশ্বাস করে, তাঁর কঠোর পদক্ষেপের কারণে মাদকের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল।
বাংলাদেশেও মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান চললেও মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই চক্র কাজ করছে বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের এই বিস্তার কেবল জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না, সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ ও কর্মজীবী মানুষের একটা অংশ মাদকের সংস্পর্শে আসছে। এর ফলে পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ঘটে যাওয়া হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী নির্যাতন ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের সাথে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্র, চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো বিপজ্জনক অপরাধচক্র গড়ে উঠছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশে ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৯ হাজার ২৫১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯ হাজার ৬৮৫ জনকে। এছাড়া শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই শতাধিক গডফাদার এবং কয়েক হাজার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে অতীতেও এমন তালিকা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি বলে নাগরিক সমাজে সমালোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক। প্রচলিত ইয়াবা, হেরোইন বা গাঁজার পাশাপাশি দেশে এখন এলএসডি, আইস, এমডিএমএ, ফেন্টানাইল, কেটামিন, ম্যাজিক মাশরুম ও কুশসহ বিভিন্ন রাসায়নিক মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সিনথেটিক মাদক দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তরুণ সমাজ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন এসব মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত তথ্য জানে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। মাদক মামলার অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত আদালতে টেকে না। উপযুক্ত সাক্ষীর অভাব, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতায় অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আসে। এছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে অনেক বড় মাদক কারবারি আইনের আওতার বাইরে থেকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে অভিযান চালানো হলেও মূল সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণ কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার প্রশ্ন। যে দেশগুলো মাদকের বিরুদ্ধে সফল হয়েছে, তারা কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনকে এ বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বড় মাদক সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় তার ওপর। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, বিচারিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা জোরদার করা গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব। বর্তমান সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান কার্যকরের সুযোগ ও পর্যাপ্ত জনসমর্থন রয়েছে। তারা যদি এই চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে নেয়, তবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা মোটেও অসম্ভব নয়।
পাঠকের মন্তব্য