![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘হাইড্রেশন বিরতি’। উত্তর আমেরিকার তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতার কথা বিবেচনায় নিয়ে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার লক্ষ্যে এবার প্রতিটি ম্যাচে বাধ্যতামূলকভাবে দুটি করে হাইড্রেশন বিরতি চালু করেছে ফিফা। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় তিন মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রাখা হচ্ছে। কাগজে-কলমে এটি খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে এর প্রভাব পড়ছে ম্যাচের কৌশল, গতি, মোমেন্টাম এবং দর্শক অভিজ্ঞতার ওপর।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমের কারণে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিশ্বকাপে হাইড্রেশন বিরতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু অনেক কোচ ও বিশ্লেষকের মতে, এই বিরতি এখন শুধু পানি পান বা বিশ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ম্যাচ চলাকালে কোচদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সাধারণত খুবই সীমিত থাকে। কিন্তু হাইড্রেশন বিরতির সময় পুরো দলকে একত্র করে নতুন কৌশল, অবস্থান পরিবর্তন কিংবা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেকের চোখে এটি কার্যত এক ধরনের ‘টাইমআউট’ বা ‘কোচিং ব্রেক’-এ পরিণত হয়েছে।
ব্রাজিল ও মরক্কোর ম্যাচে এর স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে। ম্যাচের শুরুতে ব্রাজিল ছন্দহীন ফুটবল খেললেও হাইড্রেশন বিরতির সময় কোচ নতুন কৌশল নির্ধারণ করেন। বিরতির পর মাঠে নেমে ব্রাজিলের খেলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে এবং তারা দ্রুত সমতায় ফেরে। ম্যাচ শেষে কোচও স্বীকার করেন যে, এই বিরতি দলের সমস্যা চিহ্নিত ও তাৎক্ষণিক সমাধানের সুযোগ করে দিয়েছে।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায় কুরাসাও ও জার্মানির ম্যাচেও। কুরাসাও সমতায় ফেরার পর ম্যাচে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিরতির সময় জার্মান কোচ দলকে পুনর্গঠিত করেন এবং খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর জার্মানি একতরফা আধিপত্য বিস্তার করে বড় জয় তুলে নেয়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ‘মোমেন্টাম’ বা ম্যাচের গতিপ্রবাহ ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোনো দল যখন আক্রমণের ধারাবাহিকতা তৈরি করে কিংবা গোলের পর আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়, তখন বিরতি সেই ছন্দ নষ্ট করতে পারে। ফলে ম্যাচের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ হলো, আবহাওয়া অনুকূল হলেও সব ম্যাচে বাধ্যতামূলকভাবে এই বিরতি রাখা হচ্ছে। এমনকি তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার ম্যাচেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। এতে সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন, বিষয়টি কি সত্যিই শুধুই খেলোয়াড় কল্যাণের জন্য?
অনেকের মতে, উত্তর আমেরিকার ক্রীড়া সংস্কৃতির মতো নির্দিষ্ট বিরতির সময় বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের সুযোগ তৈরিও এর একটি কারণ হতে পারে। বেশ কয়েকটি সম্প্রচারমাধ্যম হাইড্রেশন বিরতির সময় সরাসরি বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, যা দর্শকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ফুটবলপ্রেমীদের একটি অংশের অভিযোগ, এতে খেলার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশ্বকাপের মতো আসর ধীরে ধীরে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রভাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক সাবেক ও বর্তমান ফুটবলারও।
তবে অন্যদিকে ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। উত্তর আমেরিকার কয়েকটি ভেন্যুতে দিনের বেলার ম্যাচগুলো স্বাস্থ্যঝুঁকির পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। তাই খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইড্রেশন বিরতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বরং কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান তিন মিনিটের বিরতিও যথেষ্ট নয়। খেলোয়াড়দের শরীর ঠাণ্ডা করা, পর্যাপ্ত পানি ও ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং পুনরুদ্ধারের জন্য আরও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে হাইড্রেশন বিরতি নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়বে নাকি এটি খেলোয়াড় সুরক্ষার সফল উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এখনই বলা যায়, বিশ্বকাপের মাঠে এটি শুধু পানি পানের বিরতি নয়; বরং ম্যাচের কৌশল, গতি ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।