![]()
আহমেদ তোফায়েল
ত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা চরম অস্থিরতা ও অচলাবস্থার পর অবশেষে রোববার রাতে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জনস্বার্থে ও আমানতকারীদের নিরাপত্তার কথা বলে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ব্যাংকের আপাত দেখভালের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এই প্রশাসনিক অস্ত্রোপচারের সমান্তরালে, তারল্যের তীব্র সংকট সামাল দিতে পরপর দুই দিনে ব্যাংকটিকে দেওয়া হয়েছে মোট পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার। এই বিশাল অঙ্কের ‘লাইফ সাপোর্ট’ এবং পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ঘটনা আমাদের ব্যাংকিং খাতের এক গভীর ক্ষতের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ইসলামী ব্যাংকের এই পরিণতির পেছনে রয়েছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ক্ষমতার পালাবদল এবং দখল-পুনর্দখলের নোংরা ইতিহাস। প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘরানার ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটিকে ২০১৭ সালে এক প্রকার জোরপূর্বক হাতবদল করে দেওয়া হয় তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটির ৮২ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এস আলম মুক্ত করার প্রক্রিয়ায় আবারও ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদল হয়। অভিযোগ ওঠে, পুরোনো গোষ্ঠী আবারও পর্ষদ নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। আর সবশেষ চলতি বছরের শুরুতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের বসানোর চেষ্টা করলে শুরু হয় নতুন করে গৃহবিবাদ। ঈদুল আজহার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক একজন ডেপুটি গভর্নরকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ রূপ নেয় তীব্র তারল্য সংকটে।
রাজনৈতিক ক্ষমতার এই রশি টানাটানির প্রত্যক্ষ বলী হয়েছেন সাধারণ আমানতকারীরা। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা তুলে নেন আতঙ্কিত গ্রাহকেরা। যখন সাধারণ মানুষ ব্যাংকে গিয়ে নিজের কষ্টের টাকা তুলতে পারেন না, তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে তাদের বিশ্বাস উবে যায়। আর এই আস্থার সংকটই ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণের আবেদন করতে বাধ্য করেছে।
ইসলামী ব্যাংকের ভেতরের ক্ষত কতটা গভীর, তা সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। সংসদে উঠে এসেছে কীভাবে গত বছরের আগস্টের পর নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকার এলসির বিপরীতে লোন দেওয়া হয়েছে এবং সেই টাকা আর ফেরত আসেনি। এমনকি ব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘আরডিএস’-এর মাধ্যমে বিতরণকৃত ২২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকাই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যখন একটি ব্যাংকের অর্থ এভাবে রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হয়, তখন তার পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ব্যাংকটি এখন যে আড়াই হাজার কোটি টাকা করে দুই দিনে পাঁচ হাজার কোটি টাকা পেল, তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যদিও ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করেছেন যে, গ্রাহকদের টাকা তোলার প্রবণতা কমছে এবং ধারের ৪০ শতাংশ টাকাই হয়তো তাদের ব্যবহার করতে হবে না; কিন্তু এই আশ্বাস কতটা টেকসই, তা সময়ই বলে দেবে। কারণ, যতক্ষণ না একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ এবং দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রাহকদের মনে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরবে না।
ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি সাধারণ ব্যাংক নয়। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, ক্ষুদ্র ঋণ এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই ব্যাংকে যেকোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা পুরো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা বসিয়ে সাময়িকভাবে বোর্ড বা পর্ষদের কাজ চালানো সম্ভব, কিন্তু একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এবং গতিশীলতা এভাবে আমলাতান্ত্রিক উপায়ে ধরে রাখা অসম্ভব। দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য এবং নিরপেক্ষ অডিট ও পর্ষদ গঠন না হলে এই সংকট পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এখন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনুগত ব্যক্তিদের পরিবর্তে পেশাদার ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের বোর্ডে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিগত কয়েক বছরে (বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত) ইসলামী ব্যাংক থেকে যত বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার একটি ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ—তারা যে দলেরই হোক না কেন—তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল জরুরি ভিত্তিতে টাকা ধার দেওয়ার ‘দাঁতহীন বাঘ’ হিসেবে থাকলে চলবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার স্বায়ত্তশাসন ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ইসলামী ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন এবং ঋণ বিতরণের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে, যেন নতুন করে কোনো গোষ্ঠী ব্যাংকটিকে নিজেদের পকেট হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।
আমানতকারীদের মনে যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে ব্যাংকটির বর্তমান প্রশাসনকে সরাসরি ও স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। গ্রাহকদের এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তাদের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার ও এটিএম বুথগুলো থেকে নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে। আস্থার সংকট দূর না হলে কোনো পরিমাণ বিশেষ ধার দিয়েই ব্যাংকটিকে বাঁচানো যাবে না।