
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রকাশের পর দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী মহল ও ব্যবসায়ী সমাজে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা। বাজেটকে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের একটি প্রাথমিক রোডম্যাপ হিসেবে অভিহিত করেছে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)।
সিএসইআরের চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, “২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি কেবল একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার একটি প্রাথমিক ‘রিকভারি রোডম্যাপ’। আমরা লক্ষ্য করছি, সিএসইআর এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী ফোরামের কাঠামোগত সংস্কারসংক্রান্ত বহু প্রস্তাব সরকার নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”
উল্লেখ্য, গত ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রণীত প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট ঘোষণার আগে সিএসইআর একটি নীতিপত্র প্রকাশ করে, যেখানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংস্কার এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
এদিকে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রাকে স্বাগত জানালেও করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, করের আওতা সম্প্রসারণের পরিবর্তে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জ্বালানি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং ডলার সংকটের টেকসই সমাধান না হলে তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে উল্লেখ করেন। তার মতে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয় না হলে মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “প্রচলিত কর প্রশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন এবং কর ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।”
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সাকিফ শামীম আরও বলেন, দীর্ঘদিনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। তার ভাষায়, “রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় না রাখলে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।”
তবে বাজেটে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিএসইআর। সংস্থাটির মতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সিএসইআরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বা ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ কমানোর উদ্যোগ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সচল রাখতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে সংস্থাটি।