![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
• সৃজনশীল অর্থনীতিতে ৩০০ কোটি টাকা
• এসএমই খাতে ২ হাজার কোটির তহবিল
• স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স ও ৯ বছরের কর অবকাশ
• ব্লু ইকোনমি গবেষণায় ১০০ কোটি টাকা
• স্বাস্থ্য গবেষণা তহবিলে ১০০ কোটি টাকা
• স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ২ হাজার কোটি
ই-বাংলাদেশ প্রতিবেদক
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং দীর্ঘদিনের প্রবৃদ্ধিনির্ভর কাঠামোকে একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। দীর্ঘকাল ধরে উদ্ভাবন, দক্ষতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে তার দেখা মিলেছে কম। তবে এবার সেই দৃশ্যপট পরিবর্তনের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০টি নতুন কর্মসূচি ও বিশেষ তহবিলের ঘোষণা এসেছে।
স্বাস্থ্য, সৃজনশীল শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ, সমুদ্র অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রবাসীকল্যাণকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে এসব পরিকল্পনা। নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপগুলো দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক নতুন বুনিয়াদ তৈরি করবে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই রূপরেখা তুলে ধরেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানমুখী করার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বাজেটে নেওয়া নতুন এই পরিকল্পনাগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর প্রয়োগ নিয়ে কিছুটা সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, অতীতের অনেক ভালো প্রণোদনা ও বিশেষ তহবিল কেবল সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। ফলে এবারের উদ্যোগগুলোর মূল পরীক্ষা হবে এর স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, এই নতুন উদ্যোগগুলো সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য একটি ভালো বার্তা দিচ্ছে। যদি এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে তা বর্তমান সংকট কাটাতে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে বলেন, দেশ এখন স্থবির মূল্যস্ফীতি বা এক ধরনের ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে এমন একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবে রূপ দেওয়া সরকারের জন্য এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ।
সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রণোদনা :
তরুণ প্রজন্মের মেধা ও সৃজনশীলতাকে বৈশ্বিক মঞ্চে নিয়ে যেতে প্রথমবারের মতো ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা, গিটার, পিয়ানো ও ভায়োলিনের মতো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব এসেছে। কনটেন্ট নির্মাতা ও তরুণ শিল্পীদের দক্ষতা বাড়াতে এই অর্থ ব্যয় হবে। অন্যদিকে, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের সুরক্ষায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই তহবিল থেকে আইডিএলসি, বিআইএফএফএল এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ পাবেন প্রান্তিক উদ্যোক্তারা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত বার্ষিক টার্নওভারের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তরুণ ও নারীদের নতুন উদ্ভাবনী ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে চালু হচ্ছে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স’। এর আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা শূন্য শতাংশ টার্নওভার করসহ টানা ৯ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা পাবেন।
গবেষণা, জলবায়ু ও শ্রমবাজার:
সমুদ্রসম্পদের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবার ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘ব্লু ইকোনমি গবেষণা তহবিল’ গঠন করা হচ্ছে। এই টাকা ব্যয় হবে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, নতুন খনিজ অনুসন্ধান এবং সমুদ্র পর্যটন খাতের সম্ভাবনার গবেষণায়। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিকায়নে দুটি ভিন্ন তহবিল গড়া হচ্ছে।
এর মধ্যে বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য গবেষণায় ১০০ কোটি টাকা এবং বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারি মোকাবিলায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সামলাতে ১০০ কোটি টাকা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আরও ১০০ কোটি টাকার পৃথক তহবিল দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার বজায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্পগুলোর গতি ধরে রাখতে ১৭ হাজার কোটি টাকার পরিচালন ঋণের প্রস্তাবও এসেছে বাজেটে। এছাড়া রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পাশাপাশি রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া ও ব্রাজিলের মতো নতুন শ্রমবাজারের সন্ধানে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
বাজেটের এই নতুন ১০টি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর আধুনিকায়নে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বড় বড় অঙ্কের তহবিল বরাদ্দ করলেই সংকটের সমাধান হয় না। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এনে এই অর্থ যাতে প্রকৃত খাত ও প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করা না গেলে এই বিশাল পরিকল্পনা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সরকার যদি একটি কঠোর ও স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উদ্যোগগুলো পরিচালনা করতে পারে, তবে তা দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সংকট উত্তরণে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
পাঠকের মন্তব্য