
সিএসইআর’র বাজেট প্রতিক্রিয়া
কাঠামোগত রূপান্তর ও মানবিক সুরক্ষার ভারসাম্য: কেমন হলো নতুন বাজেট?
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (CSER) প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটকে একটি “অন্তর্ভুক্তিমূলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের রূপরেখা” হিসেবে আখ্যায়িত করছে। বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জের মাঝেও সরকার যেভাবে সামাজিক খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
![]()
বাজেটের আকার গত বছরের চেয়ে ১৮.৭% বৃদ্ধি পেয়ে বড় আকার ধারণ করলেও, ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর জাতীয় লক্ষ্যের সাথে এটি সংগতিপূর্ণ। তবে CSER মনে করে, এই বিশাল বাজেটের প্রকৃত রূপান্তরকারী ক্ষমতা নির্ভর করবে পুরোপুরি এর বাস্তবায়ন দক্ষতা, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর।
১. স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে গুণগত শিফট: শুধু বরাদ্দ নয়, দর্শনগত পরিবর্তন
বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা (জিডিপির ১.০%) করার প্রস্তাবকে CSER একটি যুগান্তকারী মাইলফলক মনে করে। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো, এবার চিকিৎসার ‘পকেট খরচ’ বা আউট-অফ-পকেট এক্সপেনডিচার কমানোর ওপর সুনির্দিষ্ট ফোকাস দেওয়া হয়েছে।
জীবনরক্ষাকারী সেবায় স্বস্তি: হার্টের রিং (স্টেন্ট)-এর ওপর থেকে ১০% ভ্যাট প্রত্যাহার, ডায়ালাইসিস ফিল্টারে ১৫% ভ্যাট ও ৫% অগ্রিম কর মওকুফ এবং ব্লাড টিউবিং সেটে ৭.৫% ভ্যাট প্রত্যাহার সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি: ক্যান্সারের ওষুধের ৯টি নতুন কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াত এবং ৫১টি এপিআই (API) কাঁচামালে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেশীয় ওষুধ শিল্পকে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগী করে তুলবে।
প্রযুক্তিগত বিকেন্দ্রীকরণ: প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট এবং সর্বজনীন ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা তৃণমূল পর্যায়ে বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ভিত্তি স্থাপন করবে।
২. সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের যুগলবন্দী
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে। সিনিয়র সিটিজেনদের ট্রেনের ভ্রমণ সম্পূর্ণ ফ্রি এবং মেট্রোরেলে ২৫% ছাড় দেওয়ার মানবিক সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি করতে এবং নারী উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরে নতুন অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন জনবল নিয়োগের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ৮০ শতাংশই নারী, যা নারীর প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও সমাজকাঠামোয় তাদের আর্থিক অবস্থানকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে।
৩. স্টার্টআপ ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ডিজিটাল লিপফ্রগ’
ক। ডিজিটাল ও স্মার্ট ইকোনমি গড়ার লক্ষ্যে এবারের বাজেটে স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি খাতের জন্য অভূতপূর্ব কিছু নীতিগত সুবিধা দেওয়া হয়েছে:
খ। নতুন উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোর জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা এবং সেবা আমদানি ও স্থান ভাড়ায় ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার তরুণদের নতুন ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত করবে।
গ। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভারসহ প্রধান প্রধান কম্পিউটার হার্ডওয়্যার আমদানিতে সমস্ত শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়া ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং আইটি খাতের জন্য একটি মহৎ রাষ্ট্রীয় উপহার।
ঘ। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এসএমই (SME) ফাউন্ডেশনে নিবন্ধিত সাধারণ উদ্যোক্তাদের ৫০ লক্ষ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা হয়েছে, যা সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ের কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটাবে।
৪. রাজস্ব প্রশাসন আধুনিকায়ন ও ব্যবসা সহজীকরণ
৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে সরকার করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের পরিধি বৃদ্ধি ও কর প্রক্রিয়া সহজ করার যে নীতি নিয়েছে, তাকে CSER স্বাগত জানায়।
ক। রাজস্ব ব্যবস্থায় End-to-End Automation, অনলাইন অডিট সিলেকশন এবং কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (Discretionary Power) বাতিলের প্রস্তাব সৎ ব্যবসায়ীদের কর হয়রানি থেকে মুক্তি দেবে।
খ। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫% থেকে কমিয়ে ৪% করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যে উৎসে কর মাত্র ০.৫% নির্ধারণ করার ফলে স্থানীয় শিল্পে উৎপাদন খরচ ও বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
৫. তৈরি পোশাক (RMG) ও বিকল্প রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ
বিশ্ববাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এবং এলডিসি (LDC) উত্তরণ পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুত হতে বাজেট রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দিয়েছে:
ক। রপ্তানি আয় থেকে প্রাপ্ত নগদ প্রণোদনার ওপর উৎস কর ১০% থেকে কমিয়ে ৫% করায় তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতগুলো বৈশ্বিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে।
খ। নতুন বিকল্প খাতের উদয়: বন্ডেড ওয়্যারহাউসের আওতায় স্বর্ণ আমদানি ও অলংকার রপ্তানি বিধিমালা ২০২৬ প্রণয়ন এবং জুয়েলারি সরবরাহে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০.৫% করার মাধ্যমে এই খাতকে তৈরি পোশাকের মতো একটি বিকল্প ও শক্তিশালী বৈশ্বিক রপ্তানি পণ্য হিসেবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
CSER-এর পলিসি সুপারিশ ও উপসংহার
সামগ্রিকভাবে, প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ দেশের অর্থনীতিকে একটি মানবিক ও সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা ধারণ করে। তবে কিছু বিষয়ে CSER সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিচ্ছে:
ক। ব্যাংক খাতের ওপর চাপ হ্রাস: ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেন বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর দিতে হবে। সম্ভব হলে সহজ শর্তে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়ন জোরদার করা উচিত।
খ। বাস্তবায়ন ও সুশাসন: স্বাস্থ্যখাত এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার যে দীর্ঘস্থায়ী সংকট রয়েছে — যেমন হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বা যন্ত্রাংশ অকেজো থাকা — তা শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে রাতারাতি দূর করা যাবে না। এর জন্য কঠোর প্রশাসনিক তদারকি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।
পরিশেষে, CSER বিশ্বাস করে যে, স্বচ্ছতা, গতিশীল সিদ্ধান্ত এবং গবেষণাভিত্তিক নীতি-সহায়তার সঠিক সমন্বয় ঘটলে এই বাজেট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং জুলাই ২৪-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে একটি টেকসই ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।