![]()
দীর্ঘ দুই দশক পর জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার। দেশের অর্থনীতি যখন এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট জনমনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের নীতিগত স্থবিরতা, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগে খরা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জনজীবন যখন চরমভাবে বিপর্যস্ত, তখন এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার এক মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এবারের বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়নে কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো সমস্যার সঠিক উৎস চিহ্নিত করা। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি সঠিকভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, বর্তমানের এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো বিকল্প নেই।
বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাতই যে অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চাবিকাঠি, তা এই বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করা এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবারের বাজেটের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। নিয়মনীতি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা দূর করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উৎসে করকে চূড়ান্ত অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবি পূরণ হয়েছে।
শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে এবং নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক কর কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস এবং ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ০.৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুবিধার্থে আগামী ৫ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে করছাড়ের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধান একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের বিকাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন চালুর সিদ্ধান্ত প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের উজ্জীবিত করবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেটে টার্নওভার কর ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে অনেক সহজতর করবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে বিশাল পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। তবে এই পথ মোটেও মসৃণ নয়। বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং বিগত সরকারের রেখে যাওয়া নীতিগত স্থবিরতা বা ‘আবর্জনা’ পরিষ্কার করা। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মনে পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিগত সরকারের আমলে দেশের শিল্প খাতে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মব জাস্টিস বা মব সন্ত্রাসের কারণে বহু কলকারখানা বন্ধ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়, যার ফলে লাখ লাখ শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েন। বেসরকারি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা হত্যা মামলাসহ অসংখ্য হয়রানিমূলক মামলা দেওয়ায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের পরিবেশ এতটাই বিঘ্নিত হয়েছিল যে, দীর্ঘ দেড় বছরে দেশে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসেনি। তদুপরি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার অস্বাভাবিক বাড়িয়ে বিনিয়োগের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দেশের অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ আজ দেউলিয়া হওয়ার প্রান্তে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তাদের নিয়মিত ব্যাংকের চড়া সুদ গুনে যেতে হচ্ছে।
বিগত ১৮ মাসে সব ধরনের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব আমলাতান্ত্রিক টেবিলে ফাইলবন্দি হয়ে ছিল, যার ফলে বেসরকারি খাত এক অন্ধকার টানেলে আটকা পড়ে। তাই এই বাজেট সফল করতে হলে সেই অচলাবস্থা সবার আগে ভাঙতে হবে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদেশে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে প্রতিহিংসামূলকভাবে বহু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির বিদেশ যাত্রার ওপর অন্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। বিনা কারণে ২১ মাস ধরে এই ধরনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেশের বাণিজ্য খাতের জন্য নজিরবিহীন ক্ষতি বয়ে এনেছে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিন মাস অতিবাহিত হলেও এখনো এই নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়নি।
অবশ্য সরকার এবারের বাজেটে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি বন্ধে কিছু বৈপ্লবিক আইনি সংস্কারের প্রস্তাব করেছে। ব্যবসা শুরুর নিবন্ধন, বিভিন্ন অনুমোদন ও ছাড়পত্রসহ অন্যান্য সরকারি সেবা সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ছাড়পত্র না দিলে আবেদনটি ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত’ বলে গণ্য হবে। কোম্পানির নাম ছাড়পত্র, নিবন্ধন আবেদন, ফি পরিশোধ ও সনদ প্রদান পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য অনলাইনভিত্তিক প্রাথমিক অনুমোদন ব্যবস্থা থাকবে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কাজ শুরু করে পরবর্তী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেন। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা সহজ করতে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স সেবা ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী হলেও অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগও ভেস্তে যায়। একটি নতুন কারখানা স্থাপনে ভূমি অফিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ ডজনখানেক টেবিল পার হতে হয়। জামানতের টাকা দিয়েও বছরের পর বছর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়া এদেশের উদ্যোক্তাদের অন্যতম প্রধান নিয়তি। কোনো কোনো সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের আচরণ এমন হয়, যেন দেশে শিল্প কারখানা স্থাপন করা কোনো অপরাধ। এই সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন দরকার। বাজেটের এই চমৎকার নির্দেশনাগুলো মাঠপর্যায়ে আমলারা সঠিকভাবে মানছেন কিনা, তা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য অপসারণের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে টানা যেতে পারে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা অনেক আশ্বাসের কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুধু কর্মকর্তাদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে নিজেই সরাসরি মাঠে নেমে বর্জ্য অপসারণ কাজ পরিদর্শন করেন। তিনি যখন দেখলেন বাস্তবতার সাথে সরকারি রিপোর্টের মিল নেই, তখন তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেন। প্রধানমন্ত্রীর
পরিশেষে বলা যায়, বাজেট বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সরকারের প্রকৃত ‘অংশীদার’ বা পার্টনার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ সমন্বয়, ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ-সহায়ক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাই পারে এই মাইলফলক বাজেটকে সফল করতে এবং দেশের অর্থনীতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে।
পাঠকের মন্তব্য