![]()
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে সরকারকে একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
চাকরির বাজারের চিত্রই বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা এক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি একা নন। বিডিজবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংক ও আর্থিক খাতের মাত্র ২ হাজার ৪০০টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল ৪২ লাখের বেশি। একইভাবে তৈরি পোশাক খাতের ১১ হাজার ৩৪২টি পদের জন্য আবেদন করেন ৫২ লাখেরও বেশি চাকরিপ্রার্থী।
অন্যদিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ কয়েক বছর আগে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ছয়টি বড় শিল্প ইউনিট স্থাপন করলেও গ্যাস সংযোগের অভাবে সেগুলো এখনও পূর্ণমাত্রায় চালু করা সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা ছাড়া নতুন বিনিয়োগ আসবে না।
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। প্রায় চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। আয় ও মজুরি সেই হারে না বাড়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্যের হারেও। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে তাদের জীবনযাত্রা সীমিত করে ফেলেছে। তাই নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।
ব্যবসায়ীরাও নানা সংকটে রয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াই করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, কেবল আশ্বাস দিয়ে বিনিয়োগ আনা সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা। একইসঙ্গে শিল্প খাতের জন্য শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলারও ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও লিটল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, বিনিয়োগকারীরা অন্তত ১০ বছরের একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি নীতি চান, যাতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ভরযোগ্যভাবে করা যায়। তার মতে, জ্বালানির ঘাটতির চেয়েও বড় সমস্যা হলো নীতিগত অনিশ্চয়তা।
এদিকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত আমদানির কারণে দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পও চাপের মুখে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া এ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে সরকারের সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো, মধ্যবিত্তের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং একইসঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ সামাল দেওয়া—সবকিছুই করতে হবে সীমিত সম্পদের মধ্যে।
এমন বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ স্বস্তি, ব্যবসায়ীরা আস্থা এবং তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন। এখন দেখার বিষয়, নতুন বাজেট দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানের পথ দেখাতে পারে কি না।
পাঠকের মন্তব্য