![]()
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা সতর্ক করছেন, বর্তমান তারল্য সংকটের মধ্যে সরকার যদি আবারও ব্যাপক হারে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে লক্ষ্য ছিল প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো তা ১ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা রেকর্ড ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই প্রবণতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে সাধারণত দুটি বড় প্রভাব দেখা দেয়। প্রথমত, ব্যাংকগুলোর তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি ঋণে চলে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যায়, যাকে অর্থনীতিতে “ক্রাউডিং আউট” প্রভাব বলা হয়। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
Mutual Trust Bank PLC-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর মূল ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের আয়ের মার্জিন কমে গেছে এবং তারা বিকল্প উৎস থেকে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ শাহাদৎ হোসাইন সিদ্দিকী বলেন, সরকার যদি শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেও ব্যাপক ঋণ সংগ্রহ করে, তাহলে ইতোমধ্যেই দুর্বল অবস্থায় থাকা বেসরকারি বিনিয়োগ আরও পিছিয়ে যেতে পারে। তার মতে, এটি অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
অন্যদিকে Bangladesh Institute of Bank Management-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বিকল্প হিসেবে বন্ড ও সিকিউরিটিজ বাজারকে আরও সক্রিয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ড বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে, তাহলে আর্থিক বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং আস্থার সমস্যার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ সংগ্রহের কৌশল নির্ধারণের সময় সরকারকে ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে তা কেবল আর্থিক খাতেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য