![]()
দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক Islami Bank Bangladesh PLC দখলে নেওয়ার ক্ষেত্রে শিল্পগোষ্ঠী S Alam Group নিজের অর্থ নয়, বরং ব্যাংকেরই অর্থ ব্যবহার করেছে বলে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেল বা কাগুজে কোম্পানির নামে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনায় ব্যবহার করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে ব্যাংকটির প্রায় ৭২ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নেয় একটি চক্র, যার সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
শেয়ার কেনার কৌশল ও অর্থের উৎস
বিএফআইইউ বলছে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে অন্তত ২২টি প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার ও একাধিক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকের বড় অংশের শেয়ার কেনা হয়। এ অর্থের একটি বড় অংশ এসেছে ইসলামী ব্যাংকসহ গ্রুপ-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ থেকে।
তদন্তে দেখা গেছে, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল, ব্লু ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি ভেঞ্চারস, প্লাটিনাম এনডেভারসসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনা হয়, যেগুলোর সঙ্গে এস আলম সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনে ব্যবহৃত অর্থের উৎস ছিল মূলত ব্যাংকিং সিস্টেমের ভেতরেই নেওয়া ঋণ।
একাধিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই ব্যাংকের ঋণ ব্যবহার করে সেই ব্যাংকেরই শেয়ার কেনা হয়েছে, যা তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর প্রভাব বিস্তার
বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকের মাধ্যমে আরও বিপুল ঋণ সুবিধা নেওয়া শুরু হয়। এতে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়, যা প্রতিবেদনে ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারির ঘাটতির কারণে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় চলমান ছিল।
মালিকানা ও ঋণ-জটিলতা
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকদের বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপ ও এর ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই শেয়ার কেনার অর্থ প্রবাহিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্রুপটির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েকটির বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা একই সঙ্গে শেয়ার কেনা ও ব্যাংক ঋণ ব্যবহারের যোগসূত্রকে আরও শক্তিশালী করে।
আইনি পদক্ষেপ ও আদালতের নির্দেশ
এ ঘটনায় দায়ের করা রিটের পর হাইকোর্ট শেয়ার লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানতে চেয়েছে, কীভাবে এত বড় অংশের শেয়ার মালিকানা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইনজীবীদের মতে, ব্যাংক কোম্পানি আইনে নির্ধারিত শেয়ার ধারণ সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা অবৈধ মালিকানা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিষয়টি বর্তমানে আদালতের অধীনে বিচারাধীন। আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে Bangladesh Financial Intelligence Unit বলছে, অর্থের উৎস ও লেনদেনের সংযোগ আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
Bangladesh Securities and Exchange Commission জানিয়েছে, শেয়ার মালিকানা তদারকি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলেও বড় লেনদেনে তথ্য প্রকাশ ও নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা তারা পর্যবেক্ষণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি প্রমাণিত হয় যে ব্যাংকের নিজস্ব ঋণের অর্থ ব্যবহার করেই ব্যাংকের শেয়ার কেনা হয়েছে, তাহলে এটি গুরুতর আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মালিকানা চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে।
তারা আরও বলেন, প্রকৃত অর্থের উৎস এবং লেনদেনের সংযোগ আদালতে প্রমাণ করাই এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বর্তমান পরিস্থিতি
ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিট করা হয়েছে এবং নতুন করে তদন্তে অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে আদালতে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য