![]()
রাজবাড়ী জেলায় তামাক চাষের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও কৃষিবিদরা। তাদের মতে, তামাক চাষের কারণে তিন ফসলি জমির উর্বরতা কমছে, পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার চরবেণী নগর এলাকার কৃষক করম আলী জানান, পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে আগে বাদাম, গম, ধান ও বিভিন্ন সবজির ভালো ফলন হতো। কিন্তু তামাক চাষ বাড়ার ফলে নদীর পলিমাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং আগের মতো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রাজবাড়ী জেলায় মোট ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর, গোয়ালন্দ-এ ১০ হেক্টর, পাংশা-য় ১ হেক্টর, কালুখালী-তে ৮ হেক্টর এবং বালিয়াকান্দি-তে ৪ হেক্টর জমিতে তামাক আবাদ করা হচ্ছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান বলেন, তামাকের সংস্পর্শে দীর্ঘসময় থাকলে স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দৌলতদিয়া এলাকার কৃষক নজরুল মণ্ডল জানান, তামাক কোম্পানিগুলো অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি আর্থিক সুবিধা দেওয়ায় অনেক কৃষক তামাক চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
স্থানীয় শিক্ষার্থী আনোয়ার শেখের অভিযোগ, নদীর পাড়ে তামাক চাষের কারণে স্কুলে যাতায়াতের সময় অনেকের মাথা ঘোরা, বমি ভাব ও শারীরিক অসুস্থতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তামাক কোম্পানিগুলো আগামীতে কৃষকদের আরও বেশি আর্থিক সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে, ফলে তামাক চাষের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
মিজানপুরের সাবেক চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান মনে করেন, আইনি ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নগদ লাভের আশায় কৃষকরা তামাক চাষ থেকে সহজে সরে আসবেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক চাষের সঙ্গে জড়িত কৃষকেরা “গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস” নামে পরিচিত একটি স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন। তামাক পাতা সংগ্রহের সময় ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করে মাথা ঘোরা, বমি ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় উৎপন্ন ধূলিকণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে হাঁপানি, ব্রংকাইটিস এবং ফুসফুসের গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
কৃষিবিদদের মতে, তামাক গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান, বিশেষ করে পটাশিয়াম ও নাইট্রোজেন শোষণ করে নেয়। ফলে জমির উৎপাদনক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। একই সঙ্গে তামাক চাষে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যা মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাদের মতে, খাদ্যশস্য উৎপাদনের উপযোগী জমিতে তামাক চাষ বাড়তে থাকলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে, কৃষকদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি ও পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য