![]()
ইবি রিপোর্ট
সাশ্রয়ী হওয়ায় সড়ক ও নৌপথের তুলনায় রেলপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ থাকার কথা। কিন্তু ইঞ্জিন, ওয়াগন ও লোকবল সংকটে চাহিদা অনুযায়ী এ সেবা দিতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত পাঁচ বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এতে একদিকে ব্যাহত হচ্ছে পণ্য সরবরাহ, অন্যদিকে রেলওয়ের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
রেলওয়ের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপি (আইসিডি), সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকার অবকাঠামো। এসব গন্তব্যে কনটেইনার, জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য, আমদানি-রপ্তানি পণ্য, সার, পাথর, নির্মাণসামগ্রী, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সক্ষমতার ঘাটতিতে চাহিদার তুলনায় অনেক কম পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। এ নিয়ে বন্দর, কাস্টমস এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা রেলওয়েকে চিঠিও দিয়েছেন।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৭০টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৬৭টিতে। পাঁচ বছরে ট্রেন চলাচল কমেছে ১ হাজার ৩০৩টি।
একসময় চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে প্রতিদিন একাধিক কনটেইনারবাহী ট্রেন ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে যেত। বর্তমানে এ রুটে দিনে একটির বেশি ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও রংপুরগামী তেলবাহী ট্রেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যশস্য, গম ও সার পরিবহনের ট্রেন চলাচলও কমেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের প্রধান ডিপো থেকে ওয়াগনে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ইঞ্জিন না পাওয়ায় অনেক সময় তেলভর্তি ওয়াগন দিনের পর দিন ইয়ার্ডে পড়ে থাকে। কখনো কখনো ইঞ্জিন পেতে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে তেল পৌঁছাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়।
বিপিসি ও রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে পাঠানোর জন্য ২০টি ওয়াগনে জ্বালানি তেল বোঝাই করে সিজিপিওয়াইয়ে রাখা হয়। ইঞ্জিন না পাওয়ায় ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেগুলো ইয়ার্ডেই ছিল। সিলেট ডিপোমুখী আরেকটি তেলবাহী ওয়াগন রেকও দুই সপ্তাহের বেশি সময় অপেক্ষা করে। এ ছাড়া গত ২৫ মে থেকে সিলেটগামী এবং ২৩ মে থেকে শ্রীমঙ্গলগামী জ্বালানিবাহী ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারেনি। ওই সময়ে সিলেট অঞ্চলে তেলের সংকট দেখা দিয়েছিল।
চট্টগ্রাম থেকে চারটি রুটে জ্বালানি তেল পরিবহনে প্রতিদিন অন্তত দুটি করে ট্রেন প্রয়োজন। মাসে ৬০টি ট্রেনের চাহিদা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫টি। বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সময়মতো তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সংকট তৈরি হয়। তাই এ পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগে থাকতে হয়।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ সময়ে কেনা হয়েছে মাত্র ৪০টি ইঞ্জিন। অন্যদিকে, পুরোনো ৯০টির বেশি ইঞ্জিন বহর থেকে বাদ পড়েছে। ৭০টি নতুন ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা থাকলেও এক যুগের বেশি সময়েও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালে পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়। চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন আমদানির কথা থাকলেও সেগুলো পেতে আরও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে।
চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করতে না পারায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হলে বন্দরে কনটেইনারের জট তৈরি হয়। সমস্যা সমাধানে বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমস ও রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে তাগাদা দিলেও তাতে খুব একটা সুফল পাওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক সমকালকে বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি রেলওয়ে। অথচ ট্রেনে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ব্যবসায়ীদের খরচ কমত এবং ভোক্তারাও উপকৃত হতেন। সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এখন বেশি ব্যয়ে সড়ক ও নৌপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৫৩ দিনে শুধু ইঞ্জিন সংকটের কারণে ৪৯টি পণ্যবাহী ট্রেন নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। এসব ট্রেনের মোট বিলম্বের পরিমাণ ১ হাজার ১৪৭ ঘণ্টা। এর মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন থেকে ইঞ্জিন খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করার কারণে ৪০ শতাংশের বেশি ট্রেনের বিলম্ব হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামগামী একটি জ্বালানিবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে অন্য ট্রেনে যুক্ত করায় সেটি আখাউড়ায় টানা ১২ দিনের বেশি আটকে ছিল। গত বছরের ১৯ থেকে ২৯ ডিসেম্বর ইঞ্জিন না পাওয়ায় ১১ দিন পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
রেলওয়ের বহরে থাকা ২৯৭টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৬৭টি মিটারগেজ এবং ১৩০টি ব্রডগেজ। একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সাধারণত ২০ বছর ধরা হয়। বহরের ১৪৭টি ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল এ সীমার মধ্যে থাকলেও বাকি ১৫০টির আয়ুষ্কাল অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ফলে পুরোনো ইঞ্জিন চলার পথে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে।
ইঞ্জিন, বগি ও লোকবল সংকটে কয়েক বছর ধরে ৯৯টি ট্রেন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের ৫০টি এবং পশ্চিমাঞ্চলের ৪৯টি ট্রেন রয়েছে। পূর্বাঞ্চলে চালু থাকা ট্রেনের মধ্যেও প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি চালানো সম্ভব হয় না। এসবের মধ্যে রয়েছে মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন।
রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংসদে দেওয়া তথ্যে পণ্য পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সংকটে প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ওয়াগন ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ, রেল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং আইসিডি ও লজিস্টিকস হাব নির্মাণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, পণ্যবাহী ট্রেন সচল রাখতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও সংকটের কারণে চার থেকে পাঁচটির বেশি পাওয়া যায় না। এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে রেলওয়ে।
পাঠকের মন্তব্য