![]()
ইবি রিপোর্ট
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা কিনতে শুরুতে কয়েকটি দেশীয় ব্যাংক আগ্রহ দেখালেও কর্মী আত্তীকরণের ব্যয়, বেতন কাঠামোর পার্থক্য এবং আমানত হারানোর আশঙ্কায় তারা পিছিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু সিটি ব্যাংক প্রস্তাবিত লেনদেনের আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই করতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে। তবে চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ব্যাংকটি।
ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), পূবালী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে এনডিএ সইয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়েই তারা আগ্রহ থেকে সরে আসে। মূল উদ্বেগের জায়গা হলো, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক কর্মীকে নতুন প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা।
সিটি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এনডিএ সই করলেও শেষ পর্যন্ত তারা লেনদেনে এগোবেন কি না, তা এখনো নির্ধারণ করেননি। লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং কর্মীদের আত্তীকরণের বিষয়টি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশে ওয়েলথ ও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনা যাচাইয়ের ঘোষণা দেয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। যেসব খাতে ব্যাংকটির ব্যবসার পরিধি বড় এবং স্বতন্ত্র সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে মনোযোগ বাড়ানো এই উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানানো হয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে ব্যাংকটি।
আমানত ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা
এমটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে এ ধরনের অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তাঁর মতে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে কম সুদে আমানত রাখা গ্রাহকেরা অন্য ব্যাংকে গিয়ে বেশি সুদ চাইতে পারেন। এতে নতুন ক্রেতা ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বাড়বে এবং ঋণের সুদহার প্রায় একই থাকায় মুনাফার ব্যবধান কমতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ রিটেইল আমানত তিন বা ছয় মাস মেয়াদে রাখা হয়। ফলে ব্যবসা হস্তান্তরের পর বর্তমান আমানতকারীদের কতজন নতুন ব্যাংকে থাকবেন, তা নিশ্চিত নয়। গ্রাহকেরা নতুন ব্যাংককে পছন্দ না করলে আমানত অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নিতে পারেন। এতে সম্ভাব্য ক্রেতা ব্যাংক প্রত্যাশিত আমানত ধরে রাখতে ব্যর্থ হতে পারে।
ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশটির ফেডারেল ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ক্রেডিট কার্ড পোর্টফোলিও থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ কার্ড কেনার বিষয়ে সম্মত হয়। তবে বাংলাদেশের বাজারের সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে। ভারতে এইচডিএফসি ও আইসিআইসিআইয়ের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাংক রয়েছে; বাংলাদেশের বাজারে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অবস্থান আলাদা।
কর্মী ও বেতন কাঠামোর জটিলতা
পূবালী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক আলোচনা হলেও কর্মী আত্তীকরণ, করপোরেট সংস্কৃতি এবং বেতন কাঠামোর পার্থক্যের কারণে তারা এনডিএ সই করেননি। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রায় ১ হাজার ৮০০ কর্মীর মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ জন রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সম্ভাব্য ক্রেতাকে এসব কর্মীর কতজনকে নিতে হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, কোনো ক্রেতা পাওয়া না গেলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডকে বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সময় এইচএসবিসির কর্মীদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিদায় জানানোর কথা উল্লেখ করেন। তখন ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ ব্যবস্থার আওতায় কর্মীদের বিদায় দেওয়া হয়েছিল।
ঋণ ও আমানতের পরিমাণ
ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ও সিএমএসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ৩০ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ২৮ শতাংশ ছিল এ খাতের ঋণ।
অন্যদিকে, ব্যাংকটির মোট আমানত ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রিটেইল গ্রাহকদের আমানত প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ২০ শতাংশ।
এদিকে গত পাঁচ বছরে ব্যাংকটি শাখা ও সেবাকেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়েছে। আগে প্রায় ২৪টি শাখা এবং ৮৩ থেকে ৯৬টি এটিএম বুথ থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ১৮টি শাখা ও এটিএম এবং ক্যাশ-রিসাইক্লিং মেশিনসহ ৭০টি সেলফ-সার্ভিস টার্মিনাল।
ব্যাংকটি কয়েক বছর আগে নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জমার শর্ত চালু করে। সম্প্রতি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সেবাও বন্ধ করেছে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে মাসে অন্তত দুবার অ্যাপ অচল থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা।
সব মিলিয়ে কর্মী ব্যবস্থাপনা, আমানত ধরে রাখা এবং অধিগ্রহণের আর্থিক সম্ভাব্যতা—এই বিষয়গুলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার সম্ভাব্য ক্রেতা খোঁজার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।