![]()
ইবি রিপোর্ট
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অনুমোদনের সময় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের মেয়াদ সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছরে আনার পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়াও দ্রুত করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
গত ১৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আনা বিয়ার্ডের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এসব প্রতিশ্রুতি দেয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার বিষয়ে আলোচনা এখনো চলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নকাল সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছরে নামিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি প্রকল্প অনুমোদনের সময় বর্তমান ১৮ মাস থেকে কমিয়ে আট মাসে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া পাঁচ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ) চূড়ান্ত করতে সম্মত হয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের কাছেও ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব
বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকেও নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি সরকার।
সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। তবে ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে দুই সংস্থার শর্ত সমন্বয় করে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণে আলোচনা চলছে।
অতিরিক্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি ব্যয় মেটানো, জরুরি পণ্য আমদানি, ব্যাংকগুলোর পুনর্মূলধনীকরণ এবং আর্থিক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে তা ব্যবহার করা হতে পারে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবে চারটি অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রিফর্ম ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ (আরআরআইপি) কাঠামোর আওতায় অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এতে চারটি প্রধান খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
- বাণিজ্য অর্থায়ন: জ্বালানি ও সারের মতো জরুরি পণ্য আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
- বাণিজ্য সহজীকরণ: ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) বিকাশে সহায়তা দেওয়া।
- ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার: আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার করা।
- অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা: বৈশ্বিক ও বহিরাগত অভিঘাত মোকাবিলায় সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো।
গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আরআরআইপি উপস্থাপন করে বাংলাদেশ। অর্থমন্ত্রী এই অর্থায়ন উদ্যোগকে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব ও প্রাথমিক সুপারিশও বিনিময় হয়েছে।
ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার ও কর প্রশাসনে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে খেলাপি ঋণ কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়ানো ও আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।
পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও পেশাদার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপকদের আগ্রহ তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
কর প্রশাসন সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি নির্ধারণ ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।