![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশের খুচরা বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়েছে। কোথাও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ভোক্তারা সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, আমদানিতে অর্থায়নের জটিলতা এবং পরিবহন সমস্যাকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে বাজারে চাহিদার চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ বা ব্যাহত হওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহন ব্যয়ে চাপ
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলোতে এলপিজি আনার খরচও বাড়ছে।
এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইগ্যাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল ও গন্তব্যে পরিবর্তন আসায় এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আনতে বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হতে পারে, এমন প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তা নির্ভর করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং জাহাজগুলোকে আবার আগের কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে।
আমদানিতে অর্থায়নের জটিলতা
ওমেরা এলপিজির চিফ অপারেটিং অফিসার মাথেন্দ্র ডি যয়োশা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, আমদানিতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং দেশের বাজারে সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপের মধ্যেও ওমেরা পেট্রোলিয়াম নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা ও আমদানিতে অর্থায়নের জটিলতার কারণে দেশের কয়েকটি বড় এলপিজি অপারেটর স্বাভাবিক আমদানি কার্যক্রম বজায় রাখতে পারছে না। ফলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় পণ্যের প্রাপ্যতায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
মাথেন্দ্র ডি যয়োশার ভাষ্য, ওমেরার আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালনগত প্রস্তুতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত আমদানি চালু রাখতে পেরেছে। তবে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে তাদের সরবরাহ সক্ষমতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ
বিইআরসি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। ওমেরা এলপিজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত মূল্যসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কোনো কোনো খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
আইগ্যাসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কোম্পানির আমদানি ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক বিক্রির হিসাব সংরক্ষণ করে এবং এসব তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। তাদের মতে, বাজারে দাম নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার; এ পরিস্থিতি কোনো একটি কোম্পানির কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল নয়।
তবে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি থাকলে খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে এবং ভোক্তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
স্থিতিশীলতার জন্য সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
ওমেরা এলপিজির কর্মকর্তা মনে করেন, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আমদানিকারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পরিবেশকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমদানি অর্থায়নের বাধা দূর করা, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং খুচরা পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ভোক্তাদের জন্য এলপিজির প্রাপ্যতা বাড়ানো সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থাও এলপিজির বাজারে প্রভাব ফেলছে। ফলে দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক করতে আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার ওপর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।