![]()
ইবি রিপোর্ট
ভারী জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে কনফিডেন্স গ্রুপ। ২০২৮ সালের মধ্যে মোট ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি।
কোম্পানিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও বাগেরহাটে ১০০ মেগাওয়াট করে মোট ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। বাগেরহাটের মোংলার কাছের প্রকল্পটি ডরিন পাওয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়িত হবে। এতে ডরিন পাওয়ারের মালিকানা থাকবে ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে, ফটিকছড়িতে আরও ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজেস ও কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি যৌথভাবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
সম্প্রতি বগুড়ায় কোম্পানিটির বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন গণমাধ্যমকর্মী ও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। এ সময় নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনার তথ্য জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির চেয়ারম্যান ইমরান করিম টিবিএসকে বলেন, ভবিষ্যতের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং কোম্পানির বিদ্যমান ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মূলত দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এবং আমাদের বিদ্যমান পোর্টফলিও বাস্কেটে বৈচিত্র্য আনতেই নতুন করে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজেসের সঙ্গে যৌথভাবে প্রস্তাবিত ২০০ মেগাওয়াটের আরেকটি প্রকল্পে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মালিকানা থাকবে ৪৯ শতাংশ। ইমরান করিমের ভাষ্য, ‘এই বিনিয়োগ বিদ্যুৎ খাতে আমাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে কোম্পানির আয় ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারহোল্ডারদের লাভবান করবে।’
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থায়নে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজার থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি। কোম্পানিটির প্রাথমিক প্রসপেক্টাস বা রেড-হেরিং প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, প্রস্তাবিত শেয়ার বিক্রির বিষয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের অবহিত করতে আগামী ১৮ অক্টোবর একটি রোডশো অনুষ্ঠিত হবে। এতে সরাসরি, ডিজিটাল মাধ্যমে কিংবা দুই পদ্ধতিতেই অংশ নেওয়া যাবে।
আইপিওর অর্থের ৮৩ শতাংশ দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি কেনা ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে ১৫ শতাংশ এবং আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ে রাখা হবে বাকি ২ শতাংশ।
প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১০০ মেগাওয়াট প্রকল্পে ইক্যুইটি হিসেবে ২৩০ কোটি টাকা এবং ডরিন পাওয়ারের সঙ্গে মোংলার ১০০ মেগাওয়াট প্রকল্পে ১০২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ আংশিক পরিশোধে ৬০ কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য আইপিও ব্যয়ের জন্য ৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
দুটি প্রকল্পে ব্যাংকঋণ, পুঁজিবাজারের অর্থায়ন, প্রেফারেন্স শেয়ার ও শেয়ারহোল্ডারদের নিজস্ব বিনিয়োগের সমন্বয়ে অর্থ জোগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ২০০ মেগাওয়াট প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর ৭৫ শতাংশ বা প্রায় ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ থেকে আসবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি।
ইমরান করিমের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে প্রতিবছর ৬.২ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এ চাহিদা প্রায় ৪১ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৮৪ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন ও গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ এর চেয়ে কম। সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন হয় প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সিস্টেম লস বাদ দিলে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছায় প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
ইমরান করিম বলেন, ‘চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়াতে হবে। কিন্তু নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান না মিললে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতাই সৌরবিদ্যুতের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি ২০১৯ সাল থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কোম্পানিটির মতে, সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ আর্থিক সক্ষমতা ও সম্পদের ভিত্তি বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক বাজারমূল্য শক্তিশালী করবে।
কোম্পানির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ সুপারিশ না করে মুনাফা সংরক্ষণের ফলে রিটেইন্ড আর্নিংস দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির মোট বকেয়া ব্যাংকঋণ ৮১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প অর্থায়নে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ৩০০ কোটি টাকা এবং কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর ২৪১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এ কাশেম অ্যান্ড কোংয়ের নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৪৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে আয় ছিল ২ হাজার ৩৯৯.৭৩ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ৪৮৬.৪২ কোটি টাকা।
কোম্পানির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বার্ষিক আয় বেড়ে ৩ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ৯৭৬ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি ১০ বছর মেয়াদি রোডম্যাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৯৩ মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে ভারী জ্বালানি তেলনির্ভর উৎপাদন থেকে সরে এসে সৌরবিদ্যুৎ, গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে বহুমুখী কার্যক্রম গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপ শেষে ২০২৯ সালে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ২০৩২ সালে তা ১ হাজার ৯৬০ মেগাওয়াট এবং তৃতীয় ধাপে ২০৩৫ সালে ২ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ৩৩ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ সম্প্রসারণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
কোম্পানিটি চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে—কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া, কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুর, জোডিয়াক পাওয়ার চট্টগ্রাম এবং কনফিডেন্স অ্যান্ড ডরিন পাওয়ার। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্মিলিতভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এর মধ্যে বগুড়ার দুটি কেন্দ্রের সক্ষমতা ২২৬ মেগাওয়াট, রংপুর কেন্দ্রের ১১৩ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ৫৪ মেগাওয়াট।
কোম্পানিটির ভারী জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ২০১৯ সালের মার্চ থেকে নভেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। কেন্দ্রগুলোর কার্যকাল ধরা হয়েছে ১৫ বছর। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মালিকানা ধরে রাখা এবং সেগুলো পরিচালনার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করাই কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মূল ব্যবসা।
পাঠকের মন্তব্য