
ইবি রিপোর্ট
ইউরিয়া সার আমদানির অর্থায়নে প্রথমবারের মতো বেসরকারি ব্যাংককে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুবিধা দিতে মোট ১ হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি চেয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)। দুই ব্যাংকের জন্য ৫০০ কোটি টাকা করে গ্যারান্টির সুপারিশ করা হয়েছে।
এতদিন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে সার আমদানির এলসি খুলত বিসিআইসি। কিন্তু আগের সার আমদানির ঋণ পরিশোধে চাপ তৈরি হওয়ায় এসব ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন করে এলসি খোলার সক্ষমতা কমছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে বিসিআইসির সার আমদানির বকেয়া ঋণ ছিল ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। দ্রুত এই ঋণ পরিশোধ না হলে তা খেলাপি হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, সার আমদানির সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংক যুক্ত হলে আমদানির অর্থায়নে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে আমদানির বড় অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমেই হবে। অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গ্যারান্টি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং শিগগিরই তা অনুমোদন হতে পারে। তাঁর মতে, সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনের সময় তারা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কি না।
বেসরকারি ব্যাংক যুক্ত করার উদ্যোগের পেছনে মূল কারণ বিসিআইসির অর্থায়ন সংকট। সার আমদানির পর ব্যাংক থেকে নেওয়া পোস্ট-ইমপোর্ট ফাইন্যান্সিং বা পিআইএফ ঋণ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় নতুন এলসি খোলার সক্ষমতা কমছে। অথচ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১২ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তাই নতুন ব্যাংক যুক্ত করে আমদানির অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে বিসিআইসি। একই সঙ্গে পুরোনো ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ইউরিয়া আমদানির আগের ঋণের ৭ হাজার ৬২৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা অপরিশোধিত ছিল। এর সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেওয়া ৮ হাজার ৫৮২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা যোগ হয়ে মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৬ হাজার ২১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে গত ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে বকেয়া রয়েছে ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
পিআইএফ ব্যবস্থায় ব্যাংক আমদানি করা সারের মূল্য পরিশোধ করে। পরে সার বিক্রি করে ১৮০ দিনের মধ্যে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করার কথা। কিন্তু সার বিক্রির বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকির অর্থ পেতে সময় লাগায় নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না বিসিআইসি। এ কারণে ঋণের মেয়াদ ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৭২০ দিন বা দুই বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোও সরকারের গ্যারান্টির মেয়াদ দুই বছর করার শর্ত দিয়েছে। এ জন্য ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করেছে বিসিআইসি।
বর্তমানে সার আমদানির জন্য সোনালী ব্যাংকের অনুকূলে ৭ হাজার কোটি, জনতা ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি রয়েছে। সব মিলিয়ে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য গ্যারান্টির পরিমাণ ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে এবার ব্র্যাক ও প্রাইম ব্যাংকের জন্য আরও ১ হাজার কোটি টাকার গ্যারান্টি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে সার আমদানির প্রয়োজন বাড়ার আরেকটি কারণ হয়ে উঠেছে গ্যাস সংকট। ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘ হলে উৎপাদন আরও কমতে পারে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিসিআইসি ১৪ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানি করেছে। চলতি অর্থবছরে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ টন। তবে গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আমদানির প্রয়োজন হতে পারে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে ভিন্ন চিত্রের কথা জানিয়েছেন কৃষকেরা। ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সরকার জানিয়েছে, দেশে সব ধরনের সার মজুত রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন। বোরো ও রবি মৌসুমের চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন বেশি মজুত থাকার কথা।
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম, রাজশাহী ও লালমনিরহাটসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা সরকার নির্ধারিত দামে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। কোথাও ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার মিলছে না। কেউ কেউ খোলাবাজার বা অননুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে সার কিনছেন। সার না পাওয়ার অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ এবং ডিলারদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকার মাঠপর্যায়ের সমস্যাকে মূলত সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার সংকট হিসেবে দেখছে। এ জন্য ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠনের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি শূন্য ডিলার পয়েন্টে নতুন ডিলার নিয়োগ এবং জেলা পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য