![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ক্যামেরুনের রাজনীতিতে পল বিয়া যেন এক রহস্যময় অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে তার উপস্থিতি খুবই সীমিত। দেশের বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করাও তার জন্য নতুন কিছু নয়। তবে এবার ইউরোপ সফরে গিয়ে দুই মাসের বেশি সময় দেশে না ফেরায় তার স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পরিচিত ৯৩ বছর বয়সী পল বিয়া গত ৭ জুন ‘সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত সফরে’ ইউরোপের উদ্দেশে ক্যামেরুন ছাড়েন। কিন্তু সেই সফর এখন দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ এই অনুপস্থিতি ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য তার অসুস্থতার খবর অস্বীকার করা হয়েছে। ক্যামেরুন সরকারের মুখপাত্র রেনে ইমানুয়েল সাদি ফরাসি রেডিও আরএফআইকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট পল বিয়া বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থান করছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি নন এবং সুস্থ আছেন বলেও দাবি করেছেন সাদি। তবে প্রেসিডেন্টের বর্তমান অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি তিনি।
চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায়
পল বিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্যামেরুনের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে প্রায় একাকার হয়ে গেছে। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে স্থায়ীভাবে বসেন।
সে সময় দেশটির তরুণ শিক্ষার্থী এনফর্মি বিমের বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। আজ তার বয়স ৬৫ বছর এবং তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। অথচ পল বিয়া এখনো ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট।
গত বছর অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি অষ্টম মেয়াদে জয়ী হন। বিরোধীরা ওই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। নতুন মেয়াদ তাকে আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়
পল বিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে ক্যামেরুন সরকার বরাবরই এসব খবর অস্বীকার করে এসেছে। এমনকি ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা নিষিদ্ধ করে সরকার। বিষয়টিকে তখন ‘জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে এবার তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে—৯৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট আসলে কতটা সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন?
সরকার তার সুস্থতার কথা বললেও প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন কার্যক্রম, সরকারি দায়িত্ব পালনের ধরন কিংবা দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে প্রবীণ শাসক
পল বিয়ার দীর্ঘ শাসন ক্যামেরুনের পাশাপাশি আফ্রিকার রাজনীতির একটি বড় বৈপরীত্যও সামনে আনে। আফ্রিকা বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার মহাদেশ হলেও বহু দেশে কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন প্রবীণ নেতারা।
ক্যামেরুনের বহু প্রজন্মের মানুষ জীবনে পল বিয়া ছাড়া অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট দেখেননি। তার দীর্ঘ শাসন দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমনভাবে প্রভাব ফেলেছে যে, তরুণ প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পল বিয়ার উপস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এনফর্মি বিমের সন্তানদের বড়টির বয়স ৩২ এবং ছোটটির ১৮ বছর। তাদের প্রজন্মের কাছেও ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট মানেই পল বিয়া। একইভাবে ইয়াউন্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ বছর বয়সী ডক্টরাল শিক্ষার্থী আবিদ রিয়াসাই আচাওয়ের মতো তরুণদের কাছেও বিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি কয়েক দশক ধরে অপরিবর্তিত থাকা একটি শাসনব্যবস্থার প্রতীক।
বিয়ার অনুপস্থিতিতে ভবিষ্যৎ কী?
১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর পল বিয়া ক্যামেরুনের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট। ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় আসার পর চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
তাই তার বর্তমান দীর্ঘ অনুপস্থিতি শুধু একজন প্রবীণ প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সফরের বিষয় নয়; এটি ক্যামেরুনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে।
সরকার পল বিয়ার সুস্থ থাকার দাবি করলেও তিনি কবে দেশে ফিরবেন এবং স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ৯৩ বছর বয়সী এই নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি আগামী দিনগুলোতে ক্যামেরুনের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে।
পাঠকের মন্তব্য