![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশীয় মাছ বাড়াতে হাওরে নতুন অভয়াশ্রম
হাওর ও জলাভূমিতে মিঠাপানির দেশীয় মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। একই সঙ্গে জলমহালের প্রচলিত ইজারা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষায় নতুন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউট মিনি স্টেডিয়ামে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেন্যু পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, একসময় দেশের হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা ও জলাভূমিতে বিপুল পরিমাণ দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। তবে সময়ের সঙ্গে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং অভয়াশ্রমের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মিঠাপানির দেশীয় মাছের প্রাচুর্য অনেকটাই কমেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাওর ও জলাভূমিতে মাছের জন্য নিরাপদ প্রজনন ও সংরক্ষণস্থল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগে বড় গর্ত বা গভীর জলাধার তৈরি করে সেখানে মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, মাছের ডিম ও পোনা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারলে প্রাকৃতিকভাবেই মাছের উৎপাদন বাড়বে। তাই মিঠাপানির দেশীয় মাছ সংরক্ষণে অভয়াশ্রমভিত্তিক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
জলমহালের ইজারা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ
জলমহাল ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত ইজারা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে।
এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আইন সংসদে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ
মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সমুদ্রের পানি ও সামুদ্রিক মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণা ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
‘চায়নাদুয়ারি জাল’ বন্ধে জনসম্পৃক্ততার আহ্বান
মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী ‘চায়নাদুয়ারি জাল’ বন্ধের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব জালে ছোট পোনা থেকে শুরু করে বড় মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ধরনের জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের জীবিকার বিষয়টিও সরকার বিবেচনায় নেয় জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন এলাকায় মৎস্যজীবীদের তালিকা করা হয়েছে। তাদের খাদ্যসহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আবার মাছের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ফিরে আসুক।’ হাওর, নদী ও জলাভূমিতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
পোনা অবমুক্তির স্থান পরিদর্শন
এর আগে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর কর্মসূচির প্রস্তুতি দেখতে সকালে পাকুন্দিয়া উপজেলার থানার ঘাট ঈশাখাঁ ব্রিজ সংলগ্ন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, বাহাদিয়া পাঠানবাড়ি ঘাট এবং মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট পরিদর্শন করেন মন্ত্রী।
এসব এলাকায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে পোনা মাছ অবমুক্তির সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনের পাশাপাশি সার্বিক প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন তিনি।
পরিদর্শনকালে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশীয় মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়ানো, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের হাওর ও জলাভূমিতে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
পাঠকের মন্তব্য