![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার আগের তুলনায় কমতে শুরু করলেও সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। বিশেষ করে মুদি পণ্যের দাম একবার বেড়ে যাওয়ার পর তা আর আগের অবস্থায় ফিরে না আসায় ক্রেতাদের ওপর আর্থিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে ‘রকেটস অ্যান্ড ফেদারস ইফেক্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন—অর্থাৎ দাম খুব দ্রুত বাড়ে, কিন্তু কমে অত্যন্ত ধীরগতিতে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও সেই বাড়তি দাম বাজারে স্থায়ী হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও খাদ্যপণ্যের মূল্যচাপ দীর্ঘায়িত করেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। জুন মাসে তা কমে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে এলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনারস-এর বৈশ্বিক গ্রোসারি বিভাগের প্রধান ম্যাট হ্যামোরি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমা মানেই পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। প্রকৃত অর্থে দাম কমতে হলে ডিফ্লেশন বা মূল্যহ্রাস প্রয়োজন, যা অর্থনীতিতে খুবই বিরল ঘটনা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছর দেশটিতে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে আরও ২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে আগামী মাসগুলোতেও ভোক্তাদের ব্যয় কমার সম্ভাবনা খুব বেশি নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির সময়কার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর ফলে ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন কম দামের পণ্যের খোঁজে একাধিক দোকানে যাচ্ছেন এবং ডিসকাউন্টভিত্তিক সুপারশপগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
বেইন অ্যান্ড কোম্পানি ও নিলসেনআইকিউর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মুদি দোকানগুলোতে কেনাকাটার পরিমাণ কমেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও সেই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। গবেষণায় বলা হয়েছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ওজন কমানোর ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা কমে যাওয়াও খাদ্যপণ্যের চাহিদা হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউমেরেটরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কস্টকো, ওয়ালমার্ট ও অ্যালডির মতো ডিসকাউন্টভিত্তিক খুচরা বিক্রেতারা বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। বিপরীতে প্রচলিত সুপারমার্কেটগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব কিছুটা কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দাম কমতে দেরি হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারেড বার্নস্টেইন বলেন, খুচরা বিক্রেতারা সাধারণত বেশি দামে কেনা পণ্যের মজুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাম কমাতে চান না। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও মহামারির সময় অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফা ধরে রাখতে মূল্য কমানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে।
এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে পেপসিকোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ ও ২০২৩ সালে ধারাবাহিকভাবে কয়েক দফা পণ্যের দাম বাড়ায়। পরে বিক্রি কমে গেলে কিছু পণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নেয়।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, সব পণ্যের ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না। যেমন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলে কফির উৎপাদন কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে কফির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবার সরকারি নীতির প্রভাবেও কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে, মেক্সিকো থেকে আমদানি করা টাটকা টমেটোর ওপর ১৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রে টমেটোর দাম এক বছরে প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
তবে বাজারে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। ওয়ালমার্ট ইতোমধ্যে গরুর কিমা, ভুট্টা, চেরি, আইসক্রিম, আলুর চিপস এবং কোকা-কোলা ও পেপসির কিছু পণ্যের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে টার্গেটও কয়েকটি খাদ্যপণ্যের মূল্য হ্রাসের উদ্যোগ নেয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় খুচরা বিক্রেতারা যদি মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতা আরও বাড়ায়, তাহলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একই পথে হাঁটতে বাধ্য হবে। এর ফলে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের নিত্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটবে না বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পাঠকের মন্তব্য