![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা নিয়ে নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি বিষয়ে আগামী অক্টোবরের আলোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করবে আইএমএফের অবস্থান ও সম্মতির ওপর।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে সরকারি ব্যয়, রাজস্ব আহরণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
এর আগে আইএমএফ সরকারকে রাজস্ব ঘাটতি এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি সরকারি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তাবটি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসে বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফ প্রতিনিধিদল অর্থ বিভাগের সঙ্গে বেতন ও ভাতা বাজেটিং নিয়ে আলোচনা করেছে। সেখানে আইএমএফের প্রতিনিধিরা মত দিয়েছেন, বর্তমান রাজস্ব ভিত্তি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি বহন করার মতো পর্যাপ্ত শক্তিশালী নয়।
তারা আরও উল্লেখ করেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভর্তুকি খাতে সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হয়নি। ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আগে আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তবে সরকার এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক চাপ কমাতে সরকার ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন অথবা বিকল্প কোনো পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। অক্টোবরে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকের আগেই এ বিষয়ে সরকারের কৌশল চূড়ান্ত হতে পারে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এর সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও সরকার জনপ্রশাসন খাতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য নতুন পে স্কেল, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের ব্যয়ের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে তাদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাই নতুন পে স্কেল সময়ের দাবি হলেও, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ছাড়া এটি বাস্তবায়ন করলে বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ, আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের চূড়ান্ত ঘোষণা।
পাঠকের মন্তব্য