ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভারতের শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন ঘিরে রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনশনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভ, পুলিশের ধরপাকড় এবং সংসদের অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে বিষয়টি এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন লোক কল্যাণ মার্গের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ একাধিক বিরোধী নেতাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।
আটকের পর কংগ্রেস নেতা পবন খেরা অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধীকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দিচ্ছে না। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের অভিযোগ তোলে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত দিল্লি
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, আগের দিনের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবারও হাজারো শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, পুলিশের কঠোর অবস্থান আন্দোলন দমাতে পারেনি; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তারা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন বন্ধের দাবি জানান।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্বীকার প্রশাসনের
আন্দোলনকারী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) অভিযোগ করেছে, ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করেছে।
তবে দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘ফেক নিউজ’ বলে দাবি করেছে। একই সঙ্গে পুলিশ বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিজেপি আরও অভিযোগ করেছে, আটক আন্দোলনকারীদের আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সংগঠনটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাক্ষাতের সুযোগ না দেওয়া হলে তারা দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে।
শারীরিক অবস্থার অবনতিতে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ
দীর্ঘ অনশনের কারণে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দিল্লি হাইকোর্ট তাকে সরকারি সফদারজং হাসপাতাল থেকে তার পছন্দের মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছে।
তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমোর আবেদনের পর আদালত এ নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংসদে অচলাবস্থা
ওয়াংচুকের অনশন, এনইইটি প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার্থী আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা এবং রামমন্দিরের অনুদান নিয়ে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
বিরোধী সদস্যরা সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা ও সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন।
কেন ভারতে অনশন এখনো শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র?
ভারতে রাজনৈতিক প্রতিবাদের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে অনশন বহু দশক ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৫২ সালে পট্টি শ্রীরামুলুর ৫৮ দিনের অনশন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এনেছিল। তার মৃত্যুর পর তেলেগুভাষী মানুষের পৃথক রাজ্যের দাবি মেনে নিয়ে সরকার অন্ধ্র রাজ্য গঠনের ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঘটনাই ভারতে রাজনৈতিক অনশনকে একটি কার্যকর গণআন্দোলনের রূপ দেয়।
গান্ধীর দর্শন থেকে বর্তমান আন্দোলন
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী অনশনকে নৈতিক ও অহিংস প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, আত্মত্যাগ মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। ১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে তিনি একাধিকবার অনশন করেন, যার অনেকগুলোই সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বাধীনতার পরও অব্যাহত অনশন আন্দোলন
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসেও অনশন বহুবার আলোচনায় এসেছে।
২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিতর্কিত নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ইরম শর্মিলা চানুর টানা ১৬ বছরের অনশন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচিত হয়।
এছাড়া সমাজকর্মী মেধা পাটকরও পরিবেশ ও পুনর্বাসন ইস্যুতে একাধিকবার দীর্ঘ অনশন করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী সায়ন্তন সাহা রায় মনে করেন, ভারতে অনশন কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এটি নৈতিক চাপ তৈরিরও একটি কার্যকর উপায়।
তার মতে, আন্দোলনকারীর শারীরিক কষ্ট যত দৃশ্যমান হয়, সরকারের ওপর জনমত ও রাজনৈতিক চাপও তত বাড়তে থাকে।
তবে তিনি বলেন, এই চাপ কার্যকর হতে হলে সাধারণ মানুষের সমর্থনও প্রয়োজন।
সমালোচনাও রয়েছে
ভারতের সংবিধানের অন্যতম প্রধান স্থপতি ড. বি. আর. আম্বেদকর সাংবিধানিক গণতন্ত্রে অনশনকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে সমর্থন করেননি।
তার মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দাবি আদায়ের প্রধান পথ হওয়া উচিত সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া।
এদিকে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন অনশন চললে শরীরের চর্বির পাশাপাশি পেশিও ক্ষয় হতে থাকে এবং হৃদরোগসহ প্রাণঘাতী জটিলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
ভবিষ্যৎ কী?
সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক দল, সমাজকর্মী, শিল্পী ও বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে তাকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে আন্দোলনের পক্ষ থেকে এখনো কর্মসূচি প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াংচুকের এই অনশন শুধু একটি শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের বিষয় নয়; বরং এটি ভারতের গণতন্ত্র, প্রতিবাদের সংস্কৃতি এবং সরকারের প্রতি জনআস্থার প্রশ্নেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
পাঠকের মন্তব্য