![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেকসই শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে ব্যাংকের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে শিল্প ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ আসে পুঁজিবাজার থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ উদ্যোক্তা এখনো মূলত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, একই সঙ্গে ঋণের সুদহারও উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। একটি গভীর ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ সহজ হবে, ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত এক দশকে বাজার কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসনের ঘাটতি, নতুন ও মানসম্পন্ন কোম্পানির অভাব এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। ফলে বাজারের পরিধি প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি এবং বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ আসেনি।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল নজরদারি, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নয়ন, নতুন আর্থিক পণ্য চালু এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে নীতিগত প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কারই যথেষ্ট নয়। করনীতি, কোম্পানি আইন, সরকারি ও করপোরেট বন্ড বাজার, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন তহবিল এবং বীমা খাতসহ পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার—উভয় খাতকেই সমানভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি জানান, সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নীতিগত সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তার মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, কমিশনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এজন্য বাজার তদারকি আধুনিকীকরণ, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিতকরণ এবং তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। তিনি নীতির ধারাবাহিকতা, স্থিতিশীল কর কাঠামো এবং দক্ষ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি করপোরেট বন্ড বাজার, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণেরও আহ্বান জানান।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, ব্যাংক স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নের জন্য কার্যকর হলেও বড় শিল্প, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, পেনশন ফান্ড, বীমা তহবিল এবং করপোরেট বন্ড বাজার শক্তিশালী হলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জোগান বাড়বে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সুশাসন, স্বচ্ছতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং নীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা গেলে দেশের পুঁজিবাজার ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। তাই বর্তমান বাস্তবতায় শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি আধুনিক, কার্যকর ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।