![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
টানা ভারী বর্ষণ এবং জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে নগরীর বহু সড়ক ও আবাসিক এলাকা। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে জনজীবন অচল হয়ে পড়ে।
জলাবদ্ধতার কারণে মঙ্গলবার সকালে গণপরিবহন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ ও স্কুলগামী শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা করেন। এ সুযোগে অনেক রিকশাচালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মূল সড়কে একটি খালি রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। আগের দিন সন্ধ্যায় হাঁটুসমান পানি ভেঙে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। তার মতে, চট্টগ্রামে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই যেন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
কাতালগঞ্জের বাসিন্দা মো. হাবিব জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই তাদের বাড়ির নিচতলায় পানি উঠে যায়। মঙ্গলবার সকালে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। একইভাবে পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা ফজলুল হক জানান, কে বি আমান আলী রোড পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় তিনি অফিসে যেতে পারেননি।
জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে নেওয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি বড় প্রকল্প এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনার ত্রুটি, বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পগুলোর সুফল এখনো পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ৩৬টি খাল পুনর্খনন ও উন্নয়ন প্রকল্প ২০১৭ সালে শুরু হলেও এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। একাধিকবার সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটি এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে।
সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন জানান, প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হলেও বর্ষা মৌসুমে বাকি কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চলতি বর্ষায় জলাবদ্ধতার শঙ্কায় রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে জলাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হবে না। আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের মতে, জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় এবং শহরের প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার দখল হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন দাবি করেছেন, আগাম নালা পরিষ্কার এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে আগের তুলনায় নগরীর জলাবদ্ধতা প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। তবে টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে নতুন করে কয়েকটি এলাকায় পানি জমেছে বলে তিনি জানান।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মঙ্গলবার ছুটি ঘোষণা করেছে। এছাড়া পতেঙ্গা আকমল আলী সড়ক, বড় দিঘির পাড়-হাটহাজারী সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।