![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করেছে।
এর আগে মূল বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাওয়ায় জুন মাসে সেই লক্ষ্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ কয়েক দিনে আরও প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ যোগ হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থবছরের শেষ দিকে পরিচালন ব্যয় এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি বাড়লেও প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে সরকারের অর্থায়নের বড় অংশই ব্যাংকঋণের মাধ্যমে মেটাতে হয়েছে।
তারা জানান, পুরো অর্থবছরজুড়ে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকট তৈরি হয়নি। ফলে সরকার সহজেই অতিরিক্ত ঋণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে সরকারের জন্য একইভাবে ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ কঠিন হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশিষ্ট ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে, যা অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব সৃষ্টি করবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই কর প্রশাসন আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি কমানোর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকঋণের পরিমাণ বেড়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের দুর্বল কার্যক্রম এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি মনে করেন, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জনগণের সঞ্চয় এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪৮ শতাংশ, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর আদায়ও প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি, যা রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
পাঠকের মন্তব্য