![]()
বাসস
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের হাটবাজারের ভবনের ছাদেও সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এ অবস্থায় দেশে সহজলভ্য সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একটি পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। তাই সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
তিনি জানান, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্রেডার চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার ছাড়াই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।’
২০২৫ সালে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মোজাফফর আহমেদ বলেন, নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহক নিজস্ব ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। শিল্পকারখানায় রুফটপ সোলারের ব্যবহার বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে। দিনের বেলায় শিল্পে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকার সময় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও বেশি হয়।
পাশাপাশি বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে।
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি তা জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্যভাবে যুক্ত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা হচ্ছে। বড় প্রকল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। গ্রিডের বাইরে থাকা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ৩৭৭ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট।
আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসও ভূমিকা রাখবে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, বড় পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করতে আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং সঞ্চালন অবকাঠামো প্রয়োজন। এ জন্য ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে।
ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি পাওয়া একটি চ্যালেঞ্জ হওয়ায় পতিত ও অনুপযোগী জমি, বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে জলাশয়ভিত্তিক বা ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সেচ, ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, খামার ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন কাজে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য