![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মায়ের কোলে শুয়ে থাকা আট মাস বয়সী একটি শিশু। পাশে বাজছে একটি গান। শিশুটি গানের অর্থ বোঝে না, কথা বলতেও শেখেনি। কিন্তু সুরের তালে তার ছোট্ট আঙুল নড়ে ওঠে, চোখ স্থির হয়ে থাকে শব্দের উৎসের দিকে। এমন দৃশ্য বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে প্রতিদিনই দেখা যায়। তবে বিজ্ঞান বলছে, এই সাধারণ মুহূর্তেই শিশুর মস্তিষ্কে শুরু হয় ভবিষ্যতের ভাষা, চিন্তা ও আবেগ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরির কাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর লার্নিং অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সেস (I-LABS) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গান শোনা, তালের সঙ্গে হাততালি দেওয়া কিংবা শরীর নড়াচড়া করার অভ্যাস শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন পোস্টডক্টরাল গবেষক ক্রিস্টিনা ঝাও এবং প্রতিষ্ঠানটির সহ-পরিচালক প্যাট্রিসিয়া কুল। গবেষণায় নয় মাস বয়সী শিশুদের কয়েক সপ্তাহ ধরে গান, ছন্দ ও তালভিত্তিক বিভিন্ন খেলায় অংশ নেওয়ানো হয়। অন্যদিকে আরেকটি দলকে সাধারণ খেলায় রাখা হয়, যেখানে সংগীতের কোনো উপাদান ছিল না।
পরবর্তীতে শিশুদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা হয় ম্যাগনেটোএনসেফালোগ্রাফি (MEG) প্রযুক্তি। ফলাফলে দেখা যায়, যেসব শিশু সংগীত ও ছন্দের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল, তাদের অডিটরি কর্টেক্স এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স শব্দের ছন্দ ও ধরণ শনাক্ত করতে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দক্ষতা শুধু গান বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুরা সম্পূর্ণ নতুন ভাষার শব্দের ধরণও তুলনামূলক দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাষা শেখার ক্ষেত্রে শিশুর মস্তিষ্ক সবসময় শব্দের পুনরাবৃত্তি, ছন্দ এবং ধরণ বিশ্লেষণ করে। সংগীত সেই একই স্নায়বিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে শিশু সহজে শব্দ, বাক্য ও ভাষার গঠন বুঝতে শেখে।
বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট হাজেরা খাতুন বলেন, আমাদের সমাজে সংগীতকে অনেক সময় শুধুই বিনোদন হিসেবে দেখা হয়। অথচ শিশুর জন্য গান হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক মস্তিষ্ক প্রশিক্ষণ।
তার ভাষায়, শিশু যখন গান শোনে বা তালের সঙ্গে শরীর নাড়ায়, তখন মস্তিষ্কে এমন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে ভাষা শেখা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (UCL) সংগীত শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক গ্রাহাম ওয়েলশ দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, সংগীত শিশুদের ভাষা, গণিত, শারীরিক সমন্বয়, সামাজিক দক্ষতা এবং আবেগীয় বিকাশ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে সংগীত শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ এখনও সীমিত হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুর বিকাশের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। পরিবারের স্বাভাবিক পরিবেশেই এই চর্চা শুরু করা সম্ভব।
হাজেরা খাতুন বলেন, মা রান্না করতে করতে গুনগুন করলে, বাবা শিশুকে কোলে নিয়ে গান গাইলে কিংবা পরিবারের কেউ ঘুমপাড়ানি গান শোনালেও শিশুর মস্তিষ্ক একইভাবে উপকৃত হয়। গান গাওয়ার জন্য নিখুঁত কণ্ঠ বা বিশেষ প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গান শোনানো নয়, শিশুকে তালি দেওয়া, হাত নেড়ে ছন্দ মিলানো কিংবা সহজ বাদ্যযন্ত্রের শব্দের সঙ্গে পরিচিত করানো আরও বেশি কার্যকর। এতে একসঙ্গে সক্রিয় হয় ভাষা, মনোযোগ, মোটর দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সংগীত শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তুলতেও সহায়ক। গান শোনার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয়, যা ইতিবাচক অনুভূতি ও সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
অনেকের ধারণা, শুধুমাত্র পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সংগীত শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে কার্যকর। তবে এই ধারণাকে ভুল বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
হাজেরা খাতুন বলেন, সংগীতের উপকারিতা নির্ভর করে শিশুর সঙ্গে তার আবেগীয় সংযোগ ও ছন্দের ওপর। তাই বাংলা লোকগান, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি কিংবা দাদি-নানির মুখে শোনা ঘুমপাড়ানি গানও সমানভাবে কার্যকর।
তার মতে, “ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি” কিংবা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বাংলা ছড়াগান শুধু শিশুকে ঘুম পাড়ায় না, বরং ভাষার ছন্দ, আবেগ এবং নিরাপত্তাবোধ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুর হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার পরিবর্তে পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রতিদিন কিছু সময় গান, ছড়া কিংবা তালভিত্তিক খেলায় তাকে সম্পৃক্ত করা। এতে শিশুর ভাষা শেখা, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে।
বিজ্ঞান আজ যে সত্য প্রতিষ্ঠা করছে, বাংলাদেশের পরিবারগুলো বহু প্রজন্ম ধরে তা অজান্তেই চর্চা করে এসেছে। একটি সাধারণ গুনগুন কিংবা ঘুমপাড়ানি গানই হয়ে উঠতে পারে শিশুর ভবিষ্যৎ মেধা, ভাষা ও আবেগ গঠনের প্রথম পাঠ।
পাঠকের মন্তব্য