![]()
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় লাইসেন্স স্থগিত, অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর সরকারের বার্তা
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সরকারের কাছে সবার আগে বাংলাদেশ এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য। তাই স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলা, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বহীনতার কোনো স্থান নেই। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় মানবিক ভুল ও চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বাজেট আলোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নিহত ছয় নবজাতকের পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুধু সমবেদনা জানালেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না; মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
মন্ত্রী জানান, তদন্তে দেখা গেছে, নবজাতকদের রাখা কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কক্ষটি ছিল সম্পূর্ণ বদ্ধ, সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রবাহের ব্যবস্থা কিংবা জানালা ছিল না। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে শ্বাসরোধজনিত পরিস্থিতি (হাইপারক্যাপনিয়া) তৈরি হয় এবং একে একে নবজাতকদের মৃত্যু ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় ১৬ থেকে ১৭ জন মা আতঙ্কিত হয়ে সাহায্য চাইলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের দ্রুত উপস্থিতি ছিল না। পরে তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারা অক্সিজেনের ঘাটতি ও অবহেলার বিষয়টি স্বীকার করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। মানুষের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, অতীতের বিভিন্ন হাসপাতাল দুর্ঘটনার সঙ্গে এই ঘটনার তুলনা করা ঠিক নয়। ইউনাইটেড হাসপাতাল বা বার্ন ইউনিটের ঘটনা ছিল দুর্ঘটনাজনিত, কিন্তু আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ মানবিক অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল।
পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের ভেতরে একটি বেকারি, প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ এবং অগ্নিনিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশও দেখতে পান বলে জানান তিনি। এমন পরিস্থিতিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ভয়াবহ প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পরও হাসপাতালের মালিক ঘটনাস্থলে যাননি। বরং প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিবর্তন এনে নিজের স্ত্রীকে প্রধান নির্বাহী করা হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বাজেট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য ‘হেলথ কার্ড’ চালুর পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ওষুধের কাঁচামাল (এপিআই), ক্যান্সার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন চিকিৎসা-উপকরণের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর নামে একটি করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জনগণের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
পাঠকের মন্তব্য