![]()
বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ এখন এক উদীয়মান শক্তি। ভূ-রাজনৈতিক কারণে আমাদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় চীনের বেইজিংয়ে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনার অনুষ্ঠিত হলো। বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত এই সেমিনারে একটি বড় ঘোষণা এসেছে। চীনে শিগগির বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১২৫ জন চীনা ব্যবসায়ীর সামনে এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত।’ এই ঘোষণা দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক বড় মাইলফলক। তবে এই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের ভেতরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমলাতান্ত্রিক সংস্কার ও বৈশ্বিক অর্থনীতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি।
১. চীনা বিনিয়োগের নতুন হাওয়া
চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। চীনা বিনিয়োগকারীরা নতুন নতুন বাজার খুঁজছেন। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তাদের বাণিজ্য উত্তেজনা চলছে। এর ফলে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ নীতি গ্রহণ করছে। তারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন কেন্দ্র সরিয়ে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ে বিনিয়োগ কার্যালয় স্থাপন একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এই উদ্যোগ নিয়েছে। তারা সরাসরি চীনের মাটিতে বসে কাজ করবে। চীনা উদ্যোক্তাদের লাইসেন্স, ভিসা ও কর সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা হবে। এর ফলে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে।
২. ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ
সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। এটি মূলত ছয় মাসের একটি বিশেষ রোডম্যাপ। আমাদের দেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া বেশ জটিল। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এই জটিলতা দূর করার দাবি জানাচ্ছেন। একটি শিল্পকারখানা করতে গেলে অনেক ধরনের ছাড়পত্র লাগে। পরিবেশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। এই আমলাতান্ত্রিক জটলা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা। ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় সরকারি সেবা ডিজিটালাইজড করার কথা বলা হয়েছে। নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি আমলারা সঠিকভাবে পালন করলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিবেশ পছন্দ করেন।
৩. অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি ও বাস্তবতা
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল হচ্ছে। অন্যদিকে মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। নির্দিষ্ট দেশের জন্য ডেডিকেটেড জোন বা অঞ্চলের ধারণা অত্যন্ত কার্যকর। আনোয়ারার ভৌগোলিক অবস্থান খুব চমৎকার। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এর গুরুত্ব অনেক। চীনের বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি আকর্ষণীয় জায়গা। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় কিছু সমস্যা এখনো আছে। এসব জোনে গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নত সংযোগ সড়ক বা কানেক্টিভিটি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। বেইজিংয়ে আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি ঢাকার নীতিনির্ধারকদের কাজ করতে হবে। জমি পাওয়ার পর যেন বিনিয়োগকারীকে গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা না পেলে বিনিয়োগের ঘোষণা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
৪. ভ্যালু চেইন ও দক্ষ মানবসম্পদ
বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে গভীর শিল্প অংশীদারত্ব গড়তে চায়। কিন্তু এর জন্য আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে। সেটি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। চীনের উন্নত প্রযুক্তি খাতের শিল্পগুলো বাংলাদেশে আসবে। তারা স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ ব্যবস্থাপক ও কারিগরি প্রকৌশলী খুঁজবে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি এই চাহিদা মেটাতে পারবে? দক্ষ কর্মী না থাকলে উচ্চপদস্থ সব পদে চীন থেকে লোক আসবে। তখন বাংলাদেশ কেবল সাধারণ শ্রমিকের মজুরিটুকুই পাবে। প্রযুক্তি বা জ্ঞানের বড় কোনো স্থানান্তর ঘটবে না। সেমিনারে শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রম উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের এখন থেকেই একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করতে হবে। চীনা বিনিয়োগের চাহিদার সঙ্গে আমাদের কারিগরি শিক্ষার সংযোগ ঘটাতে হবে।
৫. অর্থনৈতিক কূটনীতি ও ভারসাম্য রক্ষা
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি বেশ জটিল। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা জরুরি। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমাদের প্রধান অংশীদার। বেইজিংয়ের সেমিনারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নিয়েছেন। পানিসম্পদ, বিমান, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং একাধিক উপদেষ্টা সেখানে ছিলেন। এটি প্রমাণ করে সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এই বিনিয়োগ যেন দেশের ওপর ঋণের অতিরিক্ত বোঝা তৈরি না করে। আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির এটি একটি বড় পরীক্ষা। চীনের বিনিয়োগ উৎপাদনশীল খাতে হওয়া উচিত। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, হালকা প্রকৌশল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়া দরকার। এতে দেশের রপ্তানি খাত আরও বৈচিত্র্যময় হবে।
৬. ডিজিটাল সেবা ও একক জানালা ব্যবস্থা
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিস এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। চীনের বিনিয়োগ কার্যালয় থেকে যেসব আবেদন আসবে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। ডিজিটাল সেবা মানে শুধু অনলাইনে ফর্ম পূরণ নয়। এর অর্থ হলো দ্রুততম সময়ে সরকারি অনুমোদন পাওয়া। আমলাতন্ত্রের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি। একজন বিনিয়োগকারী যেন কোনো টেবিলে ফাইল আটকে থাকার সংস্কৃতি না দেখেন। বেইজিংয়ের কার্যালয়টি যেন কেবল লিয়াজোঁ অফিস না হয়। এটিকে কার্যকর ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত করতে হবে। সেখানে দক্ষ ও দক্ষতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা উচিত।
৭. লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন ও সক্ষমতা
শুধু কারখানা করলেই হবে না। উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বন্দরে পৌঁছাতে হবে। আমাদের দেশের লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন খরচ অনেক বেশি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট একটি বড় সমস্যা। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার। চীনা বিনিয়োগকারীরা লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা খুব গভীরভাবে দেখেন। তারা সময় ও খরচের হিসাব করেন। বেইজিংয়ের সেমিনারে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন। এই সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে হলে বন্দরের লজিস্টিকস সেবার মান বাড়াতে হবে। কাস্টমস প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করতে হবে। কাগজের কাজ কমিয়ে পেপারলেস ট্রেড বা কাগজবিহীন বাণিজ্য চালু করা এখন সময়ের দাবি।
৮. ধারাবাহিকতা ও আস্থার পরিবেশ
বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় উপাদান হলো আস্থা। সরকারের নীতি বারবার পরিবর্তন হলে এই আস্থা নষ্ট হয়। কর নীতি, শুল্ক কাঠামো এবং কাঁচামাল আমদানির নিয়ম স্থিতিশীল থাকা দরকার। পাঁচ বা দশ বছরের একটি স্থায়ী নীতি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে। প্রধানমন্ত্রী সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণের কথা বলেছেন। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় আশার বাণী। চীনের ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত হিসাবনিকাশ করে চলেন। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর নজর রাখছেন। এই মুহূর্তে সরকারের প্রতিটি উইংকে একযোগে কাজ করতে হবে। একটি ইতিবাচক ও নিরাপদ বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
৯. ভবিষ্যৎ করণীয় ও উপসংহার
বেইজিংয়ের ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনার একটি সফল উদ্যোগ। চীনের মাটিতে প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। এটি আমাদের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় দেশের ভেতরের সুশাসনের ওপর। আসন্ন দিনগুলোতে আমাদের মূলত তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে সত্যিকার অর্থে একক জানালায় রূপান্তর করতে হবে। তৃতীয়ত, আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো দ্রুত শেষ করতে হবে।
বাংলাদেশ ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত—প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে আমাদের প্রমাণ করতে হবে। এর দায়িত্ব এখন আমলাতন্ত্র ও নীতিনির্ধারকদের ওপর। সঠিক সময়ে সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বেইজিংয়ের এই উদ্যোগ সফল হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
লেখক: আহমেদ তোফায়েল
বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পাঠকের মন্তব্য