![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড বরাদ্দকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
শিক্ষা বাজেট ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, শিক্ষাবিদ ডা. জাহেদ উর রহমান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
ড. মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তির মূল উৎস আর প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ। যে দেশ শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে, সেই দেশই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে জনমিতিক সুবিধা ভবিষ্যতে বোঝায় পরিণত হতে পারে।
শিক্ষাবিদ ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও মুখস্থনির্ভরতা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব বেশি। অথচ আধুনিক অর্থনীতিতে প্রয়োজন বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা। তিনি উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমাতে কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সিএসইআর-এর চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। তবে দক্ষতার ঘাটতির কারণে এই সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। তিনি শিক্ষা খাতের সঙ্গে শিল্পনীতি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান কৌশলের সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনার লক্ষ্যে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও সৃজনশীল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা ঋণ সুবিধার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার রোডম্যাপও তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নীতিনির্ধারণী সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গবেষণা অবকাঠামো, ল্যাব সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হলে শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। দক্ষ শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্প-শিক্ষা সংযোগের ঘাটতি দূর করতে হবে। একইসঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আগামী দিনে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।