![]()
ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় দেওয়া তার একটি মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, কূটনৈতিক মহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
গত শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ। দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতেও রূপ নিতে পারে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। আমার তো মনে হচ্ছে না, আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি, এই ১৬০ কোটি জনগণের জন্য যা ভালো হয় সেটাই করা হবে।’
মূলত আঞ্চলিক সহযোগিতা ও দুই দেশের জনগণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরলেও তার বক্তব্যের কিছু অংশ বাংলাদেশে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘ভারত ও বাংলাদেশ এক হয়ে কাজ করলে’ কিংবা ‘১৬০ কোটি মানুষের শক্তি’ প্রসঙ্গটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি সময়ে এ ধরনের মন্তব্য এসেছে যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নানা স্পর্শকাতর ইস্যুর মুখোমুখি। সীমান্তে পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাক, সীমান্ত হত্যা, ভিসা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ এখনও সংবেদনশীল। ফলে নতুন হাইকমিশনারের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক মনোযোগ কাড়ে।
ঢাকার কূটনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জনমত অত্যন্ত সংবেদনশীল। সে কারণে ‘এক হওয়া’ বা ‘একসঙ্গে শক্তি হওয়া’ ধরনের শব্দচয়ন সাধারণ মানুষের কাছে ভিন্ন বার্তা বহন করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি কেবল সহযোগিতার রূপক ভাষা, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।
তবে অনেক বিশ্লেষক ও গবেষক এ বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবেও দেখছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, দীনেশ ত্রিবেদী সম্ভবত দুই দেশের জনগণের সম্মিলিত সম্ভাবনার কথাই বলতে চেয়েছেন। তার মতে, একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই বিতর্ক সৃষ্টি করার কোনো কারণ নেই। বরং তার প্রধান দায়িত্ব হবে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহও মনে করেন, বক্তব্যটিতে শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার বার্তা রয়েছে। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশের জনগণ একটি স্বাধীন জাতি এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সবসময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দেবজ্যোতি চন্দের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার আহ্বান। তিনি এটিকে ইতিবাচক ও শুভেচ্ছামূলক বার্তা হিসেবেই দেখছেন।
বক্তব্যটি রাজনৈতিক মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান মন্তব্যটিকে ‘নিন্দনীয়’ আখ্যা দিয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও। দলটির নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলা উচিত।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের আকাশ, মাটি ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় স্বতন্ত্র এবং তা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে তিনি সীমান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
এদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার বৃহত্তর কাঠামো সার্কে ২২০ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। তাই শুধু দুটি দেশের জনগণকে একত্র করার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিনিধি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছেন। ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের রাজনীতিক হিসেবে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলা ভাষা সম্পর্কে সুপরিচিত। গত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারত কোনো ক্যারিয়ার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদকে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। অনেকের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনায় তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় নয়াদিল্লি।
তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তার একটি বক্তব্য যেভাবে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন এমন এক সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একটি বাক্যও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি, ভিসা, বাণিজ্য, আস্থা পুনর্গঠন এবং জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভাষা ও বার্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নতুন হাইকমিশনারকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য