![]()
ড. মোঃ আশফাকুল ইসলাম বাবুল
সিরিজ: ৩য় পর্ব
একটি মানুষের আকার, গঠন বা চেহারা যেমনই হোক, তার কথা, অঙ্গভঙ্গি এবং তা দিয়ে কীভাবে একটি পছন্দনীয় উপায়ে কোনো বিষয় সে উপস্থাপনা করে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও আমরা এমনই ভাবতে পারি। সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তার জনবল, সম্পদ এবং অবকাঠামো দিয়ে কীভাবে একটি পছন্দনীয় উপায়ে আইন প্রয়োগসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এবং তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বা কতটা জনকল্যাণ সাধন করে, তা থেকে সুশাসন পরিমাপ করা যায়।
দেশে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে, যেমন নদীভাঙনে বিলীন হওয়া জমি (সিকস্তি) চর আকারে জেগে উঠলে (পয়স্তি) তা জমির মালিককে ফেরত দেওয়া যাবে। অথচ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় অথবা ক্ষেত্রবিশেষে তাদের দুর্নীতি জমির মালিককে জমি পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আবার আইন দ্বারা সংরক্ষিত বনভূমিতে বন কেটে বসতি স্থাপন, এমনকি বন উজাড় করে কলকারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে। আইনে এ ধরনের অপরাধের শাস্তির বিধান থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় সুশাসনের অভাব এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা থাকার কারণে এক শ্রেণির অসৎ ব্যক্তি বা কুচক্রীমহল ধীরে ধীরে জমি দখল বা প্রাকৃতিক বনসম্পদ ধ্বংস করছে। সুতরাং আইন বাস্তবায়নের আগে জানতে হবে: আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় সুশাসনের ঘাটতি আছে কি না?
এর সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন এসেই যায়, তা হলো, আইন প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিগ্রস্ত কি না? সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমাজে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আইনে জনকল্যাণের সুব্যবস্থা থাকার পরও শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতির কারণে জনসাধারণকে তা থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়।
জমি রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে জমি বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ, পাসপোর্ট প্রদান, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল প্রদান, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা এমনকি বিচারিক সেবায়ও প্রতিনিয়ত দুর্নীতির কারণে সেবা না পাওয়া কিংবা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রক্রিয়াগত দুর্নীতিই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তি পর্যায়ের দুর্নীতিও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে।
সরকারের ঐতিহ্যবাহী সেবা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও শুধু দুর্নীতির কারণে প্রচলিত আইনের আওতায় সেবা প্রদানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যর্থতার গ্লানি ভোগ করতে হচ্ছে। তাই আইন সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।
কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তথা উচ্চ হতে নিম্ন পর্যায়ে নিয়োজিত সকল কর্মচারীর কর্মকাণ্ড সরাসরি তত্ত্বাবধান বা তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় এ তদারকিতে নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে অধীনস্থদের কাছে যোগাযোগ, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের ধারা প্রবাহিত হয়, যা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা মজবুত করে। পক্ষান্তরে প্রতিষ্ঠানের কোনো পর্যায়ে কার্যকর ও নিয়মিত তদারকির অভাব হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি, বিশেষ করে আইন প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।
এক্ষেত্রে নদীর পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। নদীর নাব্যতা রক্ষাসহ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে সচল রাখার জন্য কেউ যেন নদীর পাড়ের জমি দখল এবং সেখানে স্থাপনা গড়তে না পারে, তার জন্য দেশে বিধি-নিষেধ রয়েছে। এসব আইন প্রয়োগে নোটিশ জারি কিংবা অবৈধ দখল হয়ে থাকলে তা উচ্ছেদের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
কিন্তু সুষ্ঠু তদারকির অভাবে বুড়িগঙ্গা নদীসহ দেশের শহরসংলগ্ন অধিকাংশ নদীর পাড় দখল করে বসবাস বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠছে। ফলে দিনে দিনে নদীগুলোর নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এজন্য একটি শক্তিশালী আইন কেন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না তা নিরূপণে এ প্রশ্নটি উঠে: আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায় তত্ত্বাবধান বা তদারকি অনিয়মিত বা দুর্বল কি না?
(চলবে…)
লেখক:
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর স্ট্রাটিজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ
সাবেক অতিরিক্ত সচিব।